যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পরাশক্তি। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও তার অবস্থান প্রথম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক পরাশক্তি হিসাবে তার অবনমন ঘটেছে। আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও সর্বশেষ ইরান যুদ্ধে তার শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও সে এখন ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। চীন তার অবস্থান দখল করতে জোর কদমে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোট হিসাবে একদা শক্তিশালী হলেও এখন দুর্বল এবং পরস্পর বিচ্ছিন্নতার শিকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হরিহর সম্পর্ক এখন আর আগের মতো নেই। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবের মাত্রাও কমেছে। বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রভাবশালী দু’টি জোট হলো, জি-৭ এবং জি-২০। জি-৭-এ আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ১৯৭৫ সালে জি-৭ প্রতিষ্ঠিত হয় মূলত উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি সুরক্ষার জন্য। জি-২০ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এ জোট গঠিত হয়। জি-৭ ও ব্রিকসের সদস্য ছাড়াও এ জোটে রয়েছে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, তুরষ্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকান ইউনিয়ন। বলা আবশ্যক, নানা কারণে জি-৭ এবং জি-২০ বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। এ কারণে জোট দু’টির গুরুত্ব দিনকে দিন হ্রাস পাচ্ছে। বাস্তবতার এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের সম্ভাবনা অপার। ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রাপ্ত সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে ব্রিকস বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জোটে পরিণত হবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
আগামী বছর ব্রিকসের নেতৃত্ব দেবে চীন। শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। রোববার সম্মেলনের সমাপনী দিনে শি জিন পিং বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একক আধিপত্যের তীব্র বিরোধিতা করেন। বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন কোনো একটি দেশ বা গোষ্ঠীর ইচ্ছায় চাপিয়ে দেয়া যায় না। বিশ্বরাজনীতিতে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি বহু আগেই পরিবর্তনের সময় এসেছে। একইদিনে ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক অধিবেশনে শি জিন পিং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতি পরিহার করার আহ্বান জানান। এই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে বাস্তবমুখী করতে পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। এই পাঁচ দফা প্রস্তাব হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য, ডিজিটাল অর্থনীতি, আধুনিক উৎপাদন খাত এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মানব-সম্পদ উন্নয়ন। বিদ্যমান বাস্তবতায় শি জিন পিংয়ের এই প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক ও গুরূত্বপূর্ণ। আশা করা যায়, তার নেতৃত্বাধীন ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোতে এই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুতায়িত হবে। ব্রিকস বস্তুত পশ্চিমা শাসন, শোষণ, খবরদারি, আগ্রাসন, যুদ্ধ, সংঘাত ইত্যাদির প্রতিবাদী বা বিকল্প জোট। এই লক্ষ্য ও অবস্থান সামনে রেখেই আগামী দিনে জোটের পরিচালনপন্থা নির্ধারণ ও নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশ কেন ব্রিকসের সদস্য নয়? অতীতে যারা ক্ষমতাসীন ছিলেন, এ প্রশ্নের জবাব তারাই ভালো দিতে পারবেন। জানা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আবেদন জানায়। যে কারণেই হোক, এর সদস্যপদ লাভের সুযোগ তার হয়নি। তবে জোটের অন্তর্গত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য বাংলাদেশ। যেহেতু ব্রিকস গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর সুতরাং, জোটের সদস্যপদ লাভ করা বাংলাদেশের অধিকারও বটে। চীন ব্রিকসের নেতৃত্বে আসায় বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের সম্ভাবনা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। সরকার এ ব্যাপারে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবে বলে আমরা আশা করি।