ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমানের শিক্ষাজীবন, গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন উদ্যোগ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসে উচ্চশিক্ষা, তিন দশকের বেশি শিক্ষকতা, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমান।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অঙ্গনে অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমান একটি পরিচিত নাম। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ১৫তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা, গবেষণা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তোলার নানা উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে তাঁর কর্মজীবনের বিবরণে।
পারিবারিক পরিচয় ও সামাজিক অঙ্গীকার
১৯৭০ সালের ১০ জুন জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমান। তাঁর পারিবারিক পরিবেশে রাজনীতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও জনসেবার চর্চা ছিল। তাঁর পিতা মো. হাবিবুর রহমান (নগোরী) ১৯৭৮ সালে বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার ৭ নম্বর খোট্টাপাড়া ইউনিয়নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন বলে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে তাঁর মা মোমেনা খাতুন খোট্টাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের মনোনীত নারী সদস্য হিসেবে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক এই পরিবেশ তাঁর শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাজীবনে অর্জন
অধ্যাপক মতিনুর রহমানের শিক্ষাজীবন শুরু থেকেই কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯০ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৯১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি লাভ করেন। স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস (UNSW) থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নয়ন অধ্যয়ন ও এনজিও কার্যক্রম বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কর্মজীবন
১৯৯৬ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে যোগদান করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অধ্যাপক পদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে তিনি সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর হিসেবে উন্নীত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও তাঁর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, লোকপ্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান এবং সোশ্যাল স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, সাদ্দাম হোসেন হলের প্রভোস্ট এবং প্রেস প্রশাসনের দায়িত্বেও ছিলেন।
২০২৬ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৮০-এর ১০(১) ধারা অনুযায়ী তাঁকে চার বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে প্রদত্ত জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় অধ্যাপক মতিনুর রহমানের ভূমিকার বিষয়টিও তাঁর জীবনবৃত্তান্তে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান এবং শিক্ষকসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর এই অবস্থান এবং আন্দোলনের সময়কার ভূমিকা পরবর্তীতে উপাচার্য হিসেবে তাঁর নিয়োগকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষক রাজনীতি ও পেশাজীবী সংগঠনে সম্পৃক্ততা
অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার মধ্যে রয়েছে বিএনপিপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউটিএবি)। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের প্যানেল সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক হিসেবে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালে তিনি জিয়া পরিষদের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। ২০১২ সাল থেকে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের আজীবন সদস্য হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।
শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বেও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ২০০৫ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০৯ সালে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছর বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সহসভাপতি এবং ২০০৬ সালে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্যও তাঁর জীবনবৃত্তান্তে রয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ সদস্য এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের বিসিএস ক্যাডার মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে বিভাগীয় বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে যুক্ত থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণা ও প্রকাশনায় অবদান
গবেষণাক্ষেত্রেও অধ্যাপক মতিনুর রহমানের উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। তাঁর জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে তাঁর ৩৪টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালে জার্মানির ল্যামবার্ট একাডেমিক পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত Poverty and Development in Bangladesh এবং ২০১১ সালে এএইচ ডেভেলপমেন্ট পাবলিশিং হাউজ থেকে প্রকাশিত NGO and Development – Myth and Reality।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশ্বায়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বিশ্বরাজনীতি নিয়েও তাঁর গবেষণা ও প্রবন্ধ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে ASEAN: A Quest for Development and Regionalism (২০০০), Globalization: An Analysis (২০০১) এবং Dynamics of Kosovo Crisis (২০০২)।
এ ছাড়া নেপাল, নরওয়েসহ বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
উপাচার্য হিসেবে আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন উদ্যোগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা: শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে দক্ষ করে তুলতে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জাপানি ও চীনা ভাষা শেখার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
গবেষণা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে বাস্তবমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর করতে 'ইসলামী ইউনিভার্সিটি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন হাব' এবং 'ইন্ডাস্ট্রি-ইউনিভার্সিটি কোলাবরেশন কমিটি' গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।
ডিজিটাল প্রশাসন ও ERP বাস্তবায়ন: প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গতিশীলতা আনতে পূর্ণাঙ্গ এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ERP) ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞ দলের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সামনে যেসব প্রত্যাশা
একজন শিক্ষক, গবেষক ও প্রশাসক হিসেবে অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমানের দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষক নেতৃত্ব ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তাঁর সামনে এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিকীকরণ, গবেষণার বাণিজ্যিক প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা আগামী দিনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে তাঁর নেতৃত্বের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে এখন বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি।