ট্রাম্প সতর্ক করলেন ইরানে হামলা প্রশ্নে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের

Total Views : 14
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ড্রপ সাইট নিউজ, মিডল ইস্ট আই : ইরানের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ সামরিক অভিযানের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ড্রপ সাইট নিউজ’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে গতকাল রোববার থেকেই ইরানে সুপরিকল্পিত হামলা শুরু করতে পারেন। তবে এই হামলার মূল লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা নয়, বরং শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ‘শিরচ্ছেদ’ কৌশল প্রয়োগ করে দেশটিতে সরকার পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ ঘটানো। মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীরা মনে করছেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারলে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে এবং বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে। সাবেক এক শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই হামলার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তিনি ট্রাম্পকে এই আশ্বাসও দিয়েছেন যে তেহরানে পশ্চিমাঘেঁষা নতুন সরকার গঠনে ইসরাইল পূর্ণ সহযোগিতা করবে। ট্রাম্প নিজেও গত শুক্রবার ওভাল অফিসে এক বক্তব্যে বিশাল মার্কিন নৌবহর ইরানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো এখন চরম সতর্কাবস্থায় রয়েছে।

ইতোমধ্যে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে তারা তাদের আকাশসীমা বা আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না।এদিকে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলায় ইরানও নজিরবিহীন পাল্টাহুমকি দিয়ে রেখেছে। দেশটির সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আক্রমিনিয়া স্পষ্ট করেছেন, আমেরিকানরা যদি মনে করে দুই ঘণ্টার অপারেশন চালিয়ে টুইট করে যুদ্ধ শেষ করে দেবে, তবে তারা ভুল স্বর্গে বাস করছে। তিনি সতর্ক করেছেন, হামলা হলে যুদ্ধের পরিধি পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা ও তাদের ঘাঁটিগুলো ইরানি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হবে। ইরানের বর্তমান সামরিক নেতৃত্ব এবার ‘সীমিত প্রতিক্রিয়ার’ পুরোনো নীতি ত্যাগ করে অন্তত ৫০০ মার্কিন সেনার প্রাণহানি ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে কঠোর জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

যুদ্ধের এই ঘনঘটার মধ্যেই কূটনৈতিক আলোচনার শেষ চেষ্টা চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইস্তাম্বুলে তুর্কি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানিয়েছেন, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত হলেও চাপ বা হুমকির মুখে নতি স্বীকার করবেন না। বিশেষ করে দেশের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তুরস্কের মধ্যে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের রণতরীগুলো ইরানের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

ভয়ে-আতঙ্কে খাবার ও পানি মজুত করছে সাধারণ মানুষ: উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির মধ্যে ইরানিরা এক ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে আসন্ন মার্কিন হামলার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ায় জনগণের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত ৩০ জানুয়ারি রাত থেকেই এই থমথমে পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষ নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে কোনো বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার আশঙ্কায়।

তেহরানের রাজপথে দৈনন্দিন জীবন আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও ঘরের ভেতরে দৃশ্যপট একেবারেই ভিন্ন। অনেক বাসিন্দা সম্ভাব্য বোমাবর্ষণের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে নিজেদের বাড়ির জানালার কাঁচ স্কচটেপ বা বিশেষ কায়দায় সিল করে দিচ্ছেন। বাসিন্দাদের মতে, বোমা হামলা শুরু হলে সরকার সমর্থক আর বিরোধী পক্ষের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকবে না; সবাই একইভাবে বিপদে পড়বে। এই বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বেঁচে থাকার উপায় এবং জরুরি প্রস্তুতির নানা পরামর্শ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই অন্তত ১০ দিনের শুকনো খাবার, পানি এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম মজুত করছেন। এমনকি বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্তরা তিন মাসের অগ্রিম ওষুধ কিনে রাখছেন।

ইরানের ভেতরে এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের কারণে। গত ডিসেম্বরে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে সরকারি বাহিনীর অভিযানে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। অধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, নিহতের সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ এই ক্ষোভ এবং বাইরের যুদ্ধের হুমকির মাঝখানে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ ইরানিরা। কেউ কেউ মনে করছেন মার্কিন হামলা তাদের মুক্তি দেবে, আবার অভিজ্ঞ প্রবীণরা মনে করছেন যুদ্ধ কেবল ধ্বংসই ডেকে আনবে।

প্রবাসে থাকা কয়েক মিলিয়ন ইরানিও স্বদেশের পরিবার-পরিজন নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। যুদ্ধের কারণে ইন্টারনেট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয়ে তারা উদ্বিগ্ন। যুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও জীবন নিয়ে ছিনিমিনির এই পরিবেশকে অনেকে এক করুণ রসিকতা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে জুয়া খেলার বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ৩১ জানুয়ারি রাতে ইরানে হামলা হবে কি না, তা নিয়ে হাজার হাজার ডলারের বাজি ধরা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে ‘অন্যের বিনোদনের খোরাক’ হিসেবে অভিহিত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইরানি তরুণ প্রজন্ম। একদিকে দেশের কঠোর শাসনব্যবস্থা, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব—সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইরানের সাধারণ মানুষ।

See More

Latest Photos