বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রবণতা স্পষ্ট—নারীরা গড়ে পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচেন। উন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশ পর্যন্ত প্রায় সর্বত্রই এই ব্যবধান দেখা যায়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীদের গড় আয়ু প্রায় ৭৭ বছর, যেখানে পুরুষদের ৭৪ বছর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পার্থক্যের পেছনে জৈবিক, আচরণগত ও সামাজিক নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করে। ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন : গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষেরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত থাকেন। নির্মাণ, পরিবহন বা ভারী শিল্পখাতে দুর্ঘটনার হার পুরুষদের মধ্যে বেশি। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রেও পুরুষদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়।
কেন নারীদের চেয়ে কম দিন বাঁচে! পুরুষেরা
পাশাপাশি ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবনের প্রবণতা ঐতিহাসিকভাবে পুরুষদের মধ্যে বেশি, যা হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, স্ট্রোক ও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
চিকিৎসকেরা আরও বলছেন, নারীরা সাধারণত নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেন। অনেক পুরুষ প্রাথমিক উপসর্গকে গুরুত্ব না দিয়ে দেরিতে চিকিৎসা নেন, ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে।
জেনেটিক পার্থক্যের ভূমিকা : মানুষের শরীরে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের একটি জোড়া লিঙ্গ নির্ধারণ করে। নারীদের থাকে দুটি X ক্রোমোজোম (XX), আর পুরুষদের একটি X ও একটি Y (XY)। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পুরুষের রক্তকোষ থেকে Y ক্রোমোজোম আংশিকভাবে হারিয়ে যেতে পারে—যাকে বলা হয় “মোজাইক লস অব ওয়াই” (mLOY)।
অস্ট্রেলিয়ারলা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়-এর জেনেটিক গবেষক জেনি গ্রেভস-সহ একাধিক বিজ্ঞানীর মতে, Y ক্রোমোজোম হারালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পুরুষের শরীরে Y ক্রোমোজোমের ঘাটতি বেশি, তাদের হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকিও বেশি হতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে দুটি X ক্রোমোজোম থাকায় একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যটি আংশিক সুরক্ষা দেয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে Y একটিই—এটি হারালে সেই ঘাটতি পূরণের বিকল্প থাকে না।
হরমোন ও সামাজিক প্রভাব: হরমোনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। ইস্ট্রোজেন নারীদের হৃদযন্ত্রকে কিছুটা সুরক্ষা দেয় বলে গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে টেস্টোস্টেরন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি অনেক সমাজে পুরুষদের ওপর আর্থিক ও পেশাগত চাপ বেশি থাকে, যা মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে।
প্রাণিবিদ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের আয়ু বাড়াতে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। ধূমপান ত্যাগ, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
পুরুষেরা কেন নারীদের চেয়ে কম দিন বাঁচেন—তার উত্তর একক নয়। জেনেটিক গঠন, হরমোন, জীবনযাপন ও সামাজিক বাস্তবতার সমন্বয়েই তৈরি হয় এই আয়ু ব্যবধান। তবে সচেতন পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ব্যবধান কমানো সম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।