মার্কিন আগ্রাসন ইরানে অন্যায্য ও বেআইনি:, ফ্রান্স

Total Views : 12
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ইরানে যৌথভাবে আগ্রাসন চালাচ্ছে গণহত্যাকারী ইসরাইল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র। এতে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল হওয়ায় ফ্রান্সের কাছে সহায়তা চেয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু দেশটিকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে প্যারিস। এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে মার্কিন আগ্রাসনকে সরাসরি অবৈধ বললেন ফ্রান্সের এক কূটনীতিক। ওমানে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত নাবিল হাজলাউয়ি এক একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ফ্রান্স মনে করে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধ অন্যায্য ও বেআইনি। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) প্রকাশিত 'দ্য ডেভিড হার্স্ট পডকাস্ট'-এর একটি পর্বে নাবিল হাজলাউয়ি এ তথ্য জানান। হাজলাউয়ি বলেন, এই সামরিক ‘অভিযান‘ আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে এবং আমরা কোনোভাবেই একে সমর্থন করতে পারি না। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন কোনো যৌক্তিকতা, নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রস্তাব বা এমন কোনো পরিস্থিতি দেখছি না যেখানে এই সামরিক ‘অভিযানে’ এত দ্রুত অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন ছিল।’

রাষ্ট্রদূত জানান যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি হামলাগুলো এমন এক সংকটময় মুহূর্তে চালানো হয়েছে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ওমানের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনায় অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল।

‘আমরা আমাদের অংশীদারদের কাছ থেকে এই আলোচনাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছিলাম এবং আমাদের ধারণা হয়েছিল যে বেশ কিছু বিষয় সঠিক পথেই এগোচ্ছিল,’ তিনি বলছিলেন।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি তিন সপ্তাহ আগে জানিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনার সময় ইরান কখনোই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।

বুসাইদি বলেন, ইরান তাদের বিদ্যমান পারমাণবিক পদার্থের মজুদকে ‘সর্বনিম্ন সম্ভব মাত্রায়’ নামিয়ে আনবে এবং সেগুলোকে জ্বালানিতে রূপান্তরিত করবে—যে প্রক্রিয়াটি হবে ‘অপরিবর্তনীয়’। তবে তার এ বক্তব্যের ঠিক একদিন পরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের যুদ্ধ শুরু করে।

হাজলাউয়ি বলেন, আলোচনার মাত্র কয়েকদিন পর আক্রান্ত হওয়ায় ইরানের ক্ষোভ তিনি বুঝতে পারছেন। তিনি বলেন, যখন আপনি আলোচনা করছেন এবং ঠিক তখনই আপনাকে আক্রমণ করা হয়, তখন আপনি খুব একটা খুশি হবেন না।

তিনি উল্লেখ করেন যে, ইরান সম্ভবত কিছু ছাড় দিয়েছিল, তবে তা এখনও ‘আমেরিকানদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দূরে’ ছিল। 

এই কূটনীতিক বলেন, পরমাণু ইস্যুর বাইরেও তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং এই অঞ্চলে তাদের ‘অস্থিতিশীল ভূমিকা’ নিয়ে মতপার্থক্য ছিল যা অমীমাংসিত থেকে গেছে।

যুদ্ধ 'ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া'

হাজলাউয়ি বলেন, ইসরাইল সম্ভবত দীর্ঘ আলোচনার পরিবর্তে সামরিক সংঘাতের জন্য ‘চাপ সৃষ্টি করেছে’।

তিনি আরও বলেন, ইসরাইলি ও আমেরিকানরা কীভাবে এই প্রস্তুতি এবং সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করেছে সে বিষয়ে আমি সত্যিই অবগত নই, তবে আমরা কেবল দেখতে পাচ্ছি যে গতিধারাটি ইসরাইলিদের দ্বারাই চালিত হয়েছিল।

তিনি বলেন, যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন মাস্কাটের (ওমান) পরিবেশ ছিল ‘হতাশা এবং স্পষ্ট বিষণ্ণতার’। রাষ্ট্রদূত আরও উল্লেখ করেন, এটি যুদ্ধ প্রতিরোধে এবং একটি শান্তিপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছাতে একটি স্পষ্ট সম্মিলিত ব্যর্থতা ছিল।

তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমন একটি দ্বন্দ্বে টেনে আনা হচ্ছে যা তারা চায়নি। হাজলাউয়ি আরও যোগ করেন, ইরান তার মিত্রদের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে দীর্ঘকাল ধরে ভূমিকা পালন করেছে, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা এই সমঝোতার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থল আক্রমণ 'অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ'

হাজলাউয়ি সতর্ক করে দেন যে, যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর বিস্তারের কোনো স্পষ্ট সীমা নেই। তিনি বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রাখা অব্যাহত রাখে তবে একটি ‘বিশাল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট’ আসন্ন।

হরমুজ প্রণালি ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ এবং ইরানের মাঝখানে একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ, যা এর সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের পথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখান দিয়ে বিশ্বের তেলের উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয়।

হাজলাউয়ি বলেন, ফ্রান্স এই অঞ্চলের অংশীদারদের ‘আশ্বাস’ দেওয়ার জন্য একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠালেও, ‘এই যুদ্ধে কোনোভাবেই’ জড়িত হওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। 

তিনি বলেন, ফ্রান্স প্রণালির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে মিত্রদের সঙ্গে কাজ করছে, কিন্তু সামরিক অভিযান চলাকালীন সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করবে না।

রাষ্ট্রদূত আরও যোগ করেন, মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হবে একটি ‘বিশাল গেম চেঞ্জার’ যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে। তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ বর্তমান প্রশাসনের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধ করার ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধে যাবে।

তিনি বলেন, এই প্রশাসন শুরু থেকেই বলেছিল যে তারা আগের প্রশাসনের মতো এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বা অন্তহীন যুদ্ধে যাবে না এবং তারা খুব নির্দিষ্ট হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই তাদের লক্ষ্য অর্জন করবে।

তিনি আরও যোগ করেন, তাই এটি হবে একটি সম্পূর্ণ পরিবর্তন এবং আমার ব্যক্তিগত মতে, আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটি একটি অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক ঝুঁকি।

তিনি আরও বলেন যে, মার্কিন প্রশাসনের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ‘বহুপাক্ষিকতাবাদ’ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

হাজলাউয়ি বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি দেখেছি যে তারা জাতিসংঘের অনেক সংস্থা ও অঙ্গসংগঠনে তাদের অনুদান বন্ধ করে দিয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য বিকল্প ফোরাম চালু করছে।’

এখানে তিনি সম্ভবত ট্রাম্পের তথাকথিত 'বোর্ড অব পিস'-এর কথা বুঝিয়েছেন।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই।

See More

Latest Photos