নগরবাসী তীব্র গরমে পানির কষ্টে

Total Views : 14
Zoom In Zoom Out Read Later Print

রাজধানীতে শুরু হয়েছে পানির তীব্র সংকট। প্রচণ্ড গরম, লোডশেডিং, জ্বালানি সংকট ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ঢাকা ওয়াসার উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বহুমুখী ধস নেমেছে। ওয়াসার তথ্যমতেই, গ্রীষ্ম মৌসুমে ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা ৩২৫ কোটি লিটারের বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২৮০ কোটি লিটার; অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি প্রায় ৪৫ কোটি লিটার। ফলে মিরপুর, উত্তরা, ভাটারা, শাহজাদপুর, কলাবাগানসহ নগরীর প্রায় অর্ধশত এলাকার বাসিন্দাদের জীবন তীব্র গরমে পানির অভাবে হাঁসফাঁস করছে। রাজধানীর পল্লবীতে শুক্রবার পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ক্যাম্পবাসীরা। পুলিশ ৩ ঘণ্টা পর সমস্যার সমাধানের আশ্বাসে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো উৎপাদন সক্ষমতার মিথ্যা পরিসংখ্যান এবং প্রায় ২০ শতাংশ সিস্টেম লস গোপনের কারণেই এখন চরম খেসারত দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শোধনাগারগুলোও কাঙ্ক্ষিত পানি সরবরাহে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিনুল ইসলাম  বলেন, সাধারণ সময়ে ঢাকা ওয়াসার পানির চাহিদা থাকে প্রায় ২৯০ কোটি লিটার। আর ঢাকা ওয়াসার উৎপাদন সক্ষমতা থাকে ৩১০ কোটি লিটার। কিন্তু গ্রীষ্মে চাহিদা বেড়ে যায় এবং উৎপাদন কমে যায়। ফলে এ মৌসুমে পানির চাহিদা মেটাতে ঢাকা ওয়াসাকে হিমশিম খেতে হয়। তিনি বলেন, এখন রাজধানীবাসীর পানির চাহিদা ৩২৫ কোটি লিটার। আর পানির উৎপাদন সক্ষমতা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি লিটারে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং পাম্প নষ্ট হওয়াসহ নানা কারণে এসব সংকট তৈরি হচ্ছে। তবে ঢাকাবাসীর পানির সংকট নিরসনে কাজ করছে ঢাকা ওয়াসাসংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা ওয়াসার সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সহিদ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা ওয়াসার পানির যে সংকট রয়েছে, তা নিজস্ব সক্ষমতা দিয়েই মেটানোর সুযোগ রয়েছে। সেটা হলো-পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্প; ওই প্রকল্পের সক্ষমতা দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার, উৎপাদন করা হচ্ছে ২৫ কোটি লিটার। পাইপলাইন স্থাপন না করায় পুরো সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থাপনায়ও নজর দিতে হবে। শুষ্ম মৌসুমের সংকট মোকাবিলায় বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, রাজধানীর মিরপুর, নুরপুর, পলাশপুর, দক্ষিণ দনিয়া, দক্ষিণগাঁও, শহীদনগর, চান মিয়া হাউজিং, রায়ের বাজার, ভূতের গলি, নর্থ রোড, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, তেজকুনিপাড়া, কড়াইল বস্তি এলাকা, কলাবাগান, পূর্ব মনিপুর, মধ্য মনিপুর, কাঁঠালতলা, পীরেরবাগ, দক্ষিণ রাজারবাগ, বাকপাড়া, হিজলা গলি, কালীবাড়ি, হিন্দুপাড়া, ছায়াবিথী (বাসাবো-১), শাহজাদপুর, গোপীপাড়া, কালাচাঁদপুর, খিলবাড়ীরটেক, আফতাব নগর, ভাটারা, উত্তরা সেক্টর-১১, কামারপাড়া, বনশ্রী-ডি ব্লক, বর্মণটেক, রাজাবাড়ী, উত্তরা সেক্টর-১৩, ৭ ও ৯ নম্বর এলাকায় পানির সংকট ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

জানা যায়, প্রায় আড়াই কোটি মানুষের পানি সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকা ওয়াসার এখনো ৭০ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচে কয়েকটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (পানি শোধনাগার) স্থাপন করলেও সেসব থেকে কাঙ্ক্ষিত পানি আসছে না।

সাভারের ভাকুর্তার পানি শোধনাগার তৈরি করা হয় প্রতিদিন ১৫ কোটি লিটার পানি পেতে। যদিও এখান থেকে পানি পাওয়া যাচ্ছে ৭ কোটি লিটার। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং নলকূপগুলোর পানির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী পানি উত্তোলন হচ্ছে না। পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার বাদে বাকি তিনটিতে উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। তবে জশলদিয়া প্রকল্পের সরবরাহ লাইনের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ কোটি লিটার। এছাড়া ঢাকা ওয়াসার এক হাজার ৩৩১টি গভীর নলকূপের মধ্যে প্রায় ২০০টি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ। এছাড়া মাঝে মাঝে লোডশেডিংয়ের কারণে বাকি নলকূপের পানি উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বনশ্রীর বাসিন্দা মো. সলেমান মিয়া যুগান্তরকে বলেন, কয়েকদিন ধরে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদামতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য গোসল, রান্নাসহ প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের বাসিন্দা সারোয়ার আলম যুগান্তরকে জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পানি পাচ্ছেন না তিনি। পানির গাড়ির জন্য সিরিয়াল দেওয়া লাগছে। তাতেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, কয়েকদিন ধরে মাঝে মধ্যে অল্পস্বল্প পানি পাওয়া যাচ্ছে। সে পানি দিয়ে কোনো রকম গোসল সারছি বা জরুরি প্রয়োজন মেটাচ্ছি।

মিরপুরের মনিপুরের বাসিন্দা জরিনা বেগম জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এলাকায় পানির তীব্র সংকট। এজন্য বাইরে ঢাকা ওয়াসার পানির কল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে তারা পানি সংগ্রহ করেন। সেখানেও সব সময় পানি থাকে না। এতে এলাকার বাসিন্দারা মারাত্মক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।

পল্লবীতে পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ : মিরপুর (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, পল্লবীতে পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ক্যাম্পবাসীরা। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত পল্লবীর কালশী সড়কে ঘটনাটি ঘটে। এ সময় কালশী ও পূরবী সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর ১১ নম্বর মিল্লাত ক্যাম্পের কয়েকশ বাসিন্দা পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন। এ সময় অনেকে খালি বালতি ও কলসি নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা কালশী সড়কে (উলটা বাবার মাজারসংলগ্ন) যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরে পল্লবী থানা পুলিশের একটি দল এসে সমস্যার সমাধানের আশ্বাসে তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। বিক্ষোভকারীরা জানান, ১ মাস ধরে তাদের ক্যাম্পে পানির সমস্যা। মাঝে-মধ্যে পানি এলেও বেশিক্ষণ থাকে না। পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ। কিন্তু গত ১২ দিন টানা পানি নেই। ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েও কোনো আশ্বাস মেলেনি। এজন্য বাধ্য হয়ে তারা রাস্তায় নেমেছেন।

মিল্লাত ক্যাম্পের বাসিন্দা রাজিয়া বলেন, প্রায় এক মাস ধরে ক্যাম্পে এক ফোঁটাও পানি আসেনি। আরমান বলেন, মিল্লাত ক্যাম্প ছাড়াও এই এলাকার কয়েকটি ক্যাম্পে পানি নেই। আমরা প্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পানির বিল দেই। অথচ আমাদের পানি দেওয়া হয় না।

পল্লবী থানার ওসি একেএম আলমগীর জাহান বলেন, গত কয়েকদিন আমার থানা এলাকায় ক্যাম্পের লোকজন পানির দাবিতে রাস্তা অবরোধ করছেন। আজও মিল্লাত ক্যাম্পের লোকজন রাস্তায় নেমেছেন। পানির সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

See More

Latest Photos