ওজন কমাতে জানালেন সকালের কয়েকটি কার্যকর অভ্যাসের কথা তাসনিম জারা

Total Views : 12
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ওজন কমানোর প্রক্রিয়াটি কেবল ডায়েট কিংবা জিমের ওপর নির্ভর করে না। এটি শুরু হয় আপনার সকালের কিছু সাধারণ অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে। সকালে মাত্র কয়েক মিনিটের পরিবর্তন আপনার মেটাবলিজম বাড়িয়ে চর্বি পোড়াতে সাহায্য করতে পারে। সে কারণে ওজন কমানোর জন্য সকালের কিছু কার্যকর অভ্যাস হলো—খালি পেটে পানি পান করা, প্রোটিনসমৃদ্ধ নাস্তা, সকালে ব্যায়াম, ওজন মাপা, স্বাস্থ্যকর নাস্তা সঙ্গে রাখা, রোদ পোহানো, দিনের খাবারের পরিকল্পনা এবং যোগব্যায়াম বা মাইন্ড ফুলনেস চর্চা করা। এই অভ্যাসগুলো মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে এবং সারাদিন ক্যালরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

আর ওজন কমাতে দ্রুত সাফল্য এনে দেবে এমন কিছু অভ্যাস তুলে ধরা হয়েছে। যে অভ্যাসগুলো ওজন কমানোর পাশাপাশি আপনার শরীর সুস্থ রাখতেও সহায়তা করবে। এ বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন ডা. তাসনিম জারা ও ডা. ইমা ইসলাম। 

চলুন জেনে নেওয়া যাক, ওজন কমানোর জন্য সকালের কার্যকর কয়েকটি অভ্যাস—

প্রথমত, সকালে ওজন মাপার পর সেই দিনের জন্য একটি নির্দিষ্ট অ্যাকশন পয়েন্ট ঠিক করে নেওয়া উচিত। কারণ ঠিকমতো পালন করলে এ অভ্যাস ওজন কমাতে সহায়ক হবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় এই অ্যাকশন পয়েন্টের গুরুত্ব উঠে এসেছে। ১০০ জন অতিরিক্ত ওজনের মানুষকে নিয়ে এ গবেষণাটি করা হয়। সেই গবেষণায় দেখা গেছে, ১০০ মানুষকে দুই দলে ভাগ করে এক দলকে প্রতিদিন সকালে ওজন মাপতে বলা হয়। আরেক দলকে সেদিনের জন্য একটি অ্যাকশন পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট কাজ ঠিক করতে বলা হয়, যেটি ওজন কমাতে সাহায্য করবে। এমন কাজের মধ্যে ছিল—

* আজকে আমি টেবিলে বসে, ফোন-টিভি না দেখা ছাড়া কোনো খাবার খাব না

* আজকে বন্ধুদের সঙ্গে বসে আড্ডা না দিয়ে একসঙ্গে হাঁটতে যাব

* রাত ৮টার পর আজকে কিছু খাব না

* আজকে ১০ হাজার কদম হাঁটব

এ রকম অনেক অ্যাকশন পয়েন্টের তালিকা থেকে যে কোনো একটি কাজ তারা সেদিনের জন্য ঠিক করে থাকেন। এভাবে প্রতিদিন তারা যে কোনো একটি কাজ বেছে নিত এবং সপ্তাহ শেষে চিন্তা করত— কোন কাজটি ওজন কমাতে বেশি সাহায্য করেছে।

দ্বিতীয়ত প্রতিদিন খালি পেটে আধা লিটার পানি পান করা। আপনি সকালে নাস্তা খাওয়ার আগে আধা লিটার কিংবা পূর্ণ দুই গ্লাস পানি খেয়ে নিতে পারেন। এতে পেট কিছুটা ভরে আছে এমন মনে হবে। ফলে নাস্তায় বেশি না খেলেও মনে হবে পেট ভরে গেছে। এ ছাড়া পানিতে কোনো ক্যালরি না থাকায় এটি একেবারেই ওজন বাড়ায় না। তাই নাস্তা খাওয়ার আগে কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়া আপনি আধা লিটার পানি পান করে নিতে পারেন।

দিনের অন্য সময়েও এ কৌশলটি কাজে লাগানো যায়। খাওয়ার আগে আধা লিটার পানি খেয়ে তারপর খাওয়া শুরু করলে আপনি সাধারণত যতটুকু খাবার খান, তার চেয়ে কম পরিমাণে খেয়েও হয়তো পেট ভরে যাবে। এভাবে এ অভ্যাসটি ওজন কমাতে সাহায্য করবে।

আবার অনেকের ধারণা— খাওয়ার আগে পানি পান করতে নেই, করলেও তা খাবার খাওয়ার কমপক্ষে আধা ঘণ্টা আগে পান করতে হবে। তা না হলে হজমে সমস্যা হবে। এমন ধারণা কিংবা পরামর্শের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তৃতীয়ত সকালে ব্যায়াম করা। আপনার ওজন কমাতে হলে যে ব্যায়াম করতে হবে, এটি সবারই জানা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, দিনের নানা কাজের ব্যস্ততায় সেটি পেছাতে পেছাতে আর করা হয়ে ওঠে না। তাই সকাল সকাল ব্যায়ামটা সেরে ফেললে ভালো।

যে কোনো ধরনের ব্যায়াম করা যায়। যেমন— দড়িলাফ, দ্রুত হাঁটা, দৌড়, উঠবস ও ভারোত্তোলন। যেটা সুবিধা হয়, যেটা ভালো লাগে— এমন ব্যায়াম বেছে নিয়ে সকাল সকাল ব্যায়াম করে ফেলুন। 

আর দিনের শুরুতেই তখন একটি বড় কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছেন বলে মনে হবে। এই অনুপ্রেরণা সারাদিন মন ভালো রাখতে এবং স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতেও সাহায্য করবে। বিকেলে সময় পেলে আবার ব্যায়াম করতে পারেন।

এ ছাড়া সকালে হেঁটে হেঁটে কাজ ও অফিসে যাওয়া কিংবা স্কুলে যাওয়াও একটি ব্যায়াম। সকালে বাজার কিংবা সন্তানকে স্কুলে দিতে যাওয়ার সময় হেঁটে যেতে পারেন। দূরত্ব বেশি হলে অল্প অল্প করে শুরু করুন। এরপর আস্তে আস্তে হাঁটার পরিমাণ বাড়াবেন। হাঁটার সময় দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করবেন।

রিকশায় করে যাওয়ার অভ্যাস থাকলে শেষ ১০ মিনিটের রাস্তাটুকু একটু আগে নেমে হেঁটে যাওয়া যায়। বাসে করে গেলে ১-২ স্টপ আগে নেমে বাকিটুকু হেঁটে যেতে পারেন। আর গাড়ি হলে ১০ মিনিট আগে কোথাও পার্ক করে বাকি পথ হেঁটে যাওয়ার অভ্যাস করুন। আস্তে আস্তে হাঁটার পরিমাণটা বাড়ালে প্রক্রিয়াটি আপনার জন্য সহজ হবে।

এভাবে প্রতিদিনের কাজ ও যাতায়াতের মধ্যে যদি একটু একটু করে ব্যায়ামের চর্চা শুরু করা যায়, তাহলে ব্যায়ামের অভ্যাস দৈনন্দিন জীবনের রুটিনের মতো আয়ত্তে চলে আসবে। শুধু ওজন কমানোর জন্যই না, আপনার ওজন কমার পর সেই ওজন ধরে রাখার জন্য এবং শরীর সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করা অপরিহার্য।

চতুর্থত সকালে নিয়মিত ওজন মাপা। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ওজন মাপেন, তারা ওজন কমাতে বেশি সফল হয়। এলোমেলোভাবে বছরে হাতেগোনা কয়েকবার ওজন মাপলে হয়তো সাময়িকভাবে পর দিন থেকে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করার ইচ্ছা জাগে। তবে এ প্রক্রিয়াটি নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক অনুপ্রেরণা ও দায়বদ্ধতা থাকে না। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিন সকালে উঠে নিজের ওজন মেপে ফেলুন।

যদি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো মেনে চলার পরও ওজন না কমে, তাহলে কারণটা খুঁজে বের করলে সেই অনুযায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব। ওজন মাপলেই যে ওজন কমে যাবে না তা সঠিক, কিন্তু প্রতিদিনের শুরুতে ওজন মাপার ফলে আপনার মাথায় অ্যাকশন পয়েন্টগুলো ঘোরাফেরা করবে। এর ফলে হয়তো আপনি একটু বেশি হাঁটার সিদ্ধান্ত নেবেন কিংবা একদিন ফাস্টফুড খাবেন না বলে ঠিক করবেন। এগুলোই আপনার ওজন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পঞ্চমত সুস্থ থাকতে প্রতিদিন খাবার ও পানির মতোই ঘুমানোও দরকার। ঘুম যে কেবল বিশ্রামের জন্য প্রয়োজন তা নয়; ঘুমের মধ্যেই ব্রেন সচল থাকে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে থাকে। সে কারণে ওজন কমানোর সঙ্গে ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কম ঘুমের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজনের সম্পর্ক আছে, যেটা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। কম ঘুম হলে ক্ষুধা বেশি লাগতে পারে, পরিমাণে বেশি খাওয়া হতে পারে, রাত জেগে থাকলে তখন আবার একটা কিছু খেতে ইচ্ছা করতে পারে। এ ছাড়া ঘুম কম হলে দিনে ক্লান্ত লাগতে পারে। যে কারণে হয়তো ব্যায়াম বা সময় নিয়ে ভালো খাবার খাওয়ার আগ্রহ চলে যায়। 

সে জন্য ওজন কমানোর সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভালো দেওয়া দরকার— একটানা ঘুম দরকার। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। সকালে উঠে হিসাব করে দেখুন কতক্ষণ ঘুমালেন। যদি হিসাবে ঘুম কম হয়, তাহলে ঘুমের রুটিনে পরিবর্তন আনতে হবে।

আবার সারাদিনে খাবার রুটিন ঠিক করা উচিত। বেশি ক্ষুধা লাগলে আমরা অনেক সময় অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে ফেলি। খাবারটি আদৌ স্বাস্থ্যকর কিনা সে বিষয়ে চিন্তা করার সুযোগ থাকে না। হয়তো সিঙাড়া, পুরি, জিলাপি বা কোক– হাতের নাগালে যা পাওয়া যায়, সেটাই খেয়ে ফেলা হয়। এগুলো যে খুব স্বাস্থ্যকর খাবার না তা আমরা সবাই জানি, এরপরও লোভ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এ প্রতিরোধের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে সকালে সারাদিনের নাস্তা হিসাবে কী কী খাওয়া যায় তা ঠিক করে রাখা। বাড়ির বাইরে গেলে হয়তো একটা বক্সে ফল, শসা, গাজর কিংবা টমেটো কেটে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন। বিরতির সময় সেটি খেয়ে নেওয়া যায়।

আর সকালে যদি চা-কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে সেগুলো চিনি ছাড়া খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। চিনি থেকে খুব সহজেই বাড়তি ক্যালরি আসে, যা ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে। সুস্থ থাকার জন্য আলাদা করে চিনি খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শরীর চিনি থেকে কোনো বিশেষ পুষ্টিও পায় না। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে চিনি যতটুকু এড়িয়ে চলা যায়, ততই ভালো। চা-কফিতে চিনি খাওয়া কমিয়ে দিলে কিংবা চিনি খাওয়ার অভ্যাস বাদ দিলে তা ওজন কমাতে অধিক সহায়ক হবে। অভ্যাস না থাকায় প্রথম প্রথম খেতে একটু খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু আস্তে আস্তে চিনি ছাড়া চা-কফিই ভালো লাগা শুরু করবে।

আট সপ্তাহ পর কোন দলের কতটুকু ওজন কমল তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। যারা প্রথম দলে ছিল, শুধু ওজন মেপেছে, তাদের ওজন কমে গড়ে ১ কেজির মতো। আর দ্বিতীয় দল, যারা ওজন মাপার পর একটা অ্যাকশন পয়েন্ট বেছে নিয়েছিল, তাদের ওজন কমে গড়ে ৪ কেজিরও বেশি। অর্থাৎ দুদলেরই ওজন কমে, তবে দ্বিতীয় দল থেকে প্রায় ৩ কেজির মত বেশি ওজন কমেছে!

তাই আজ থেকেই সকালে ওজন মাপার পর প্রতিদিনের জন্য একটি করে অ্যাকশন পয়েন্ট বাছাই করা শুরু করে দিন। তবে শুধু একটা পয়েন্ট মেনে চললে, যেমন কোক খাওয়া থেকে বিরত থেকে আবার দুই প্লেট ভাত খেয়ে নিলে নিশ্চয়ই ওজন কমানো সম্ভব হবে না। ওজন কমানোর জন্য স্বাভাবিকভাবেই যা যা করণীয়, তাই করতে হবে।

See More

Latest Photos