কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফা বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে পাঁচ মাসে মাসোহারা হিসাবে নিয়েছেন আড়াই কোটি টাকা। উল্লেখিত সময়ে ওই থানায় কর্মরত থেকে তিনি মাদক চোরাচালানে সহযোগিতা, মাদক সেবনকারী ও কারবারিকে আটক করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া, সীমান্তপথে চোরাচালানের সুবিধা দেওয়া এবং বাস-সিএনজিস্ট্যান্ড থেকে অসাধু উপায়ে এসব অর্থ হাতিয়ে নেন। সম্প্রতি এই ওসিকে (পুলিশ পরিদর্শক) থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রত্যাহারের পর তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
ওসি পাঁচ মাসে আড়াই কোটি টাকা ঘুস নিলেন
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাটি ভারত সীমান্তবর্তী এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। এখানে মাদক চোরাচালান অনিয়ন্ত্রিত। থানা সূত্র জানায়, সদর দক্ষিণ থানার সদ্য বিদায়ি ওসি সিরাজুল মোস্তফা গত বছরের ৭ ডিসেম্বর এ থানায় যোগদান করেন। এরপরই মাদক ব্যবসায়ী এবং চোরাকারবারিদের সঙ্গে চরম সখ্য গড়ে তোলেন।
গত ৫ মে তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
সূত্র জানায়, সিরাজুল এ থানায় যোগদানের পর ১৮ থেকে ২০টি চোরাকারবারি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি অদৃশ্যভাবে এসব কারবারিকে নিয়ন্ত্রণ এবং মাসোহারা আদায় করতেন। ওই সিন্ডিকেট ভারত থেকে সীমান্তের চোরাইপথে মোবাইল ফোন সেটসহ ইলেকট্রনিকস পণ্য, শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, আতশবাজি, কসমেটিকস, মসলা, মাদকসহ নানা চোরাইপণ্য নির্বিঘ্নে পাচার করেছে। এজন্য ওসিকে মাসোহারা দিত। প্রতিটি সিন্ডিকেট প্রতি মাসে ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দিয়েছে।
সূত্র জানায়, ওসি সিরাজুল মোস্তফার শেল্টারে কোটবাড়ীর চোরাকারবারি কাউছার হোসেন, উলুরচর মোহাম্মদপুরের আলকাছ মিয়ার ছেলে মিজানুর রহমান, মিজানের ভাই বিল্লাল হোসেন, কবির হোসেন, ১২-১৪টি মাদক এবং চোরাচালান মামলার আসামি মাহাবুল হক, ধনাজোর গ্রামের সোহাগ, সুমন, ওয়ালিদ, মাদক ব্যবসায়ী মথুরাপুরের জালাল উদ্দিন সিন্ডিকেটসহ ১৮-২০টি পৃথক সিন্ডিকেট দেদার মাদক এবং চোরাচালান ব্যবসা চালিয়েছে। ওয়্যারলেস অপারেটর মো. কাইয়ুমের মাধ্যমে বেশির ভাগ মাসোহারা আদায় করা হতো। এ ছাড়া বিদায়ি কনস্টেবল আব্দুল্লাহ, সিএনজিচালক দুলাল, মুন্সী ফারুক, এএসআই দেলোয়ারের মাধ্যমেও কিছু কিছু পয়েন্টের মাসোহারা আসত।
সদর দক্ষিণের কনেশতলা, মুড়াপাড়া, ধনপুর, কৃষ্ণনগর, যাত্রাখিল, সোনাইছড়ি, একবালিয়া, তালপট্টি সুবর্ণপুর চৌয়ারা সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান এবং মাদক আসত। চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে কচ্ছপের চালান, কক্সবাজার থেকে ইয়াবার চালান এই থানা এলাকা অতিক্রম করত। এ ছাড়া পদুয়ার বাজার এলাকায় কয়েকটি বাস কাউন্টার এবং সিএনজিস্ট্যান্ড থেকে মাসোহারা আদায় করা হতো।
স্থানীয়রা জানান, গত ২০ এপ্রিল থানা পুলিশের একটি টিম উপজেলার কচুয়ারপাড় এলাকায় আমান নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক করে। পরে ওসি কোনো প্রকার আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে আমানকে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেন। আর ওই ১০ হাজার ইয়াবা বিক্রি করে দেওয়া হয়।
গত ১১ এপ্রিল সীমান্তের শ্রীপুর শূন্য চৌমুহনী এলাকায় অ্যাপোলো-২ ডিউটি টিমের এএসআই দেলোয়ার হোসেন, সঙ্গীয় কনস্টেবল কাউছার এবং রিয়াদ ২ হাজার পিস বার্মিজ ইয়াবাসহ কচুয়ারপাড় এলাকার মনির হোসেন নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে। পরে ইয়াবার মালিক শ্রীপুরের স্বপনকেও আটক করা হয়।
ওসির নির্দেশে আড়াই লাখ টাকা উৎকোচ নিয়ে ইয়াবাগুলো রেখে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে ইয়াবাগুলো ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় স্থানীয় এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ইয়াবার এ চালান সোয়াগাজী এলাকার মাদক ব্যবসায়ী বিল্লালের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল।
মাদক ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, এর আগে এক দফায় ৩ হাজার এবং আরেক দফায় ৫ হাজার পিস ইয়াবা আত্মসাৎ করেছে থানা পুলিশ। এসব কিছু ওসি অবগত আছেন। সম্প্রতি উপজেলার বিজয়পুর বাজারসংলগ্ন ফিলিং স্টেশনে এসআই নজরুল ইসলাম এবং এসআই আব্দুল হক মাদক ব্যবসায়ী হারু মিয়ার ছেলে রবিনকে ১শ পিস ইয়াবাসহ আটক করেন। পরে ওসির নির্দেশে ৪০ হাজার টাকা ঘুস নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় ওই মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ইয়াবাগুলো নিয়ে অন্য মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
স্থানীয়রা জানান, গত পাঁচ মাসে ওসি সিরাজুল মোস্তফা এমন অপকর্ম করে দেদার দুই হাতে অর্থ কামিয়ে নিয়েছেন। মথুরাপুর এলাকার আনোয়ার হোসেন বলেন, ওসি সিরাজুল মোস্তফার শেল্টারে সীমান্তের মাদক ব্যবসায়ী এবং চোরাকারবারি সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। এখনো তাদের কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
ওয়্যারলেস অপারেটর মো. কাইয়ুম বলেন, আমাকে এসব প্রশ্ন করে লাভ নেই। আমি ওসি স্যারের যে নির্দেশ পেয়েছি, তা-ই করেছি। এএসআই দেলোয়ার হোসেন বলেন, তথ্যটি সঠিক নয়। মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশের বিরুদ্ধে বলতেই পারে।
ওসি সিরাজুল মোস্তফা বলেন, আমি মাসোহারা নিয়েছি এমন প্রমাণ নেই। এগুলো মাদক ব্যবসায়ী এবং চোরাকারবারিদের অপপ্রচার। আমি এসব অনৈতিক মাসোহারা এবং মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত নই। এ বিষয়ে সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।