ইরান যুদ্ধে কি ট্রাম্প হেরে যাচ্ছেন ? যেভাবে ‘সহজ জয়’ রূপ নিচ্ছে ‘কৌশলগত ব্যর্থতায়’

Total Views : 13
Zoom In Zoom Out Read Later Print

নির্বাচনি প্রচারণায় অপ্রয়োজনীয় সামরিক অভিযানে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক যুদ্ধাবস্থায় জড়িয়ে ফেলেছেন, যা বিশ্বমঞ্চে তার পররাষ্ট্রনীতি ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পর ট্রাম্পের সামরিক সাফল্যগুলো প্রায় সব লড়াইয়ে জয় এনে দিলেও এখন বড় একটি প্রশ্ন সামনে আসছে—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন?

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শক্ত অবস্থান, পরমাণু ইস্যুতে তেহরানের আপসহীন মনোভাব এবং দেশটির শাসনব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থাকায় বিশ্লেষকদের মধ্যে সন্দেহ বাড়ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কৌশলগত জয়গুলোকে ট্রাম্প আদৌ একটি ভূরাজনৈতিক বিজয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

কোনো স্পষ্ট শেষ রেখা ছাড়াই দুই পক্ষ এখন অনিশ্চিত কূটনীতি এবং ট্রাম্পের দফায় দফায় হামলা শুরুর হুমকির মধ্যে দোদুল্যমান। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এমন কোনো সমঝোতায় যেতে রাজি হবেন না যা তার সর্বোচ্চ চাপের নীতি থেকে পিছু হটা বা ওবামা আমলের ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয়।

অবশ্য হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-তে তার সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন বা অতিক্রম করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই সব তাস রয়েছে এবং তিনি সব পথ খোলা রাখছেন।

চাপ ও হতাশার মুখে ট্রাম্প

আসন্ন নভেম্বর মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ অজনপ্রিয় যুদ্ধ শুরু করার পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার কারণে তিনি অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র চাপের মুখে পড়েছেন। ফলে যুদ্ধবিরতির ছয় সপ্তাহ পার হওয়ার পর বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হয় একটি ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি মেনে নেওয়া, না হয় সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ঝুঁকি নেওয়া।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো, ইরান থেকে মনোযোগ ঘোরাতে ট্রাম্প কিউবার দিকে নজর দিতে পারেন, যা তিনি আগেও ইঙ্গিত করেছেন। তবে হাভানার চ্যালেঞ্জগুলোকে তিনি ভুলভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে; ঠিক যেমনটি তার উপদেষ্টারা গোপনে স্বীকার করেছেন যে, ট্রাম্প ভেবেছিলেন ইরানের অভিযানটিও গত ৩ জানুয়ারির ভেনিজুয়েলা অভিযানের মতোই সহজ হবে।

তবে ট্রাম্পের পক্ষেও যুক্তি রয়েছে। সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলেকজান্ডার গ্রে মনে করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া নিজেই একটি কৌশলগত সাফল্য এবং এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে চীনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি এনেছে।

তা সত্ত্বেও, নিজের নিয়ন্ত্রণে পরিস্থিতি না থাকায় ট্রাম্পের হতাশা স্পষ্ট। তিনি সমালোচকদের তীব্র আক্রমণ করছেন এবং গণমাধ্যমকে দেশদ্রোহী বলে অভিহিত করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহের যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ সময়।

লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা

যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল—ইরানের পরমাণু অস্ত্রের পথ বন্ধ করা, আঞ্চলিক হুমকি দূর করা এবং ইরানিদের দিয়ে তাদের শাসকদের উৎখাত করা। তবে এ লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জিত হয়নি।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জোনাথন প্যানিকফ বলেন, মারাত্মক আঘাত পাওয়ার পরও ইরানের শাসকেরা কেবল মার্কিন হামলা থেকে টিকে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারাকেই নিজেদের সাফল্য মনে করছে। ইরান এখন আত্মবিশ্বাসী যে তারা ট্রাম্পের চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করে টিকে থাকতে পারবে।

এমনকি মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলার পরও ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অক্ষুণ্ন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপরন্তু, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্দেশ দিয়েছেন যে এই ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো যাবে না। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ ইরানকে উত্তর কোরিয়ার মতো পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

পাশাপাশি, মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে, কারণ এই যুদ্ধের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর সীমাবদ্ধতা এবং অস্ত্র মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো রবার্ট কাগান লিখেছেন, এ যুদ্ধের ফলাফল ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও মার্কিন মর্যাদার জন্য বড় ধাক্কা হবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রধান কেন্দ্র। তিনি তার এক কলামে লিখেছেন, এখানে আগের স্থিতাবস্থায় ফেরার বা মার্কিনদের চূড়ান্ত বিজয়ের কোনো সুযোগ নেই, যা হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ করতে পারবে।

সূত্র: এনডিটিভি

See More

Latest Photos