ঈদ এলেই দেশের প্রেক্ষাগৃহে নতুন সিনেমা মুক্তির ব্যস্ততা বেড়ে যায়। আসন্ন ঈদুল আজহাও এর ব্যতিক্রম নয়। ঈদের আর মাত্র দুই দিন বাকি, আর এই সময়েই জানা গেছে এবার মুক্তির তালিকায় রয়েছে মোট নয়টি সিনেমা।
ঈদে হল মালিকরা একসঙ্গে ৯টি সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় চিন্তায়
তবে এতগুলো সিনেমার বিপরীতে দেশে নিয়মিত চালু থাকা হলের সংখ্যা মাত্র ৬০ থেকে ৭০টির মতো। যদিও প্রদর্শক মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঈদ উপলক্ষে সাময়িকভাবে আরও ২০ থেকে ৩০টি হল চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
এবারের ঈদে মুক্তির মিছিলে আছে রকস্টার, মালিক, রইদ, মাসুদ রানা, নাকফুলের কাব্য, দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল, পিনিক, বনলতা সেন ও তছনছ।
সাধারণত ঈদের আগে একাধিক সিনেমা মুক্তির ঘোষণা এলেও শেষ মুহূর্তে কিছু সিনেমা সরে দাঁড়ায়। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ঈদের মাত্র দুই দিন আগে পর্যন্ত কোনো সিনেমাই মুক্তির তালিকা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়নি। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, সবগুলো সিনেমাই একসঙ্গে মুক্তি পেতে যাচ্ছে।
একই সময়ে এত বেশি সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় প্রতিটি ছবি পর্যাপ্ত শো পাবে না বলে আশঙ্কা করছেন হল মালিকরা। এর ফলে মাল্টিপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিন—দুই ধরনের হলেই তৈরি হয়েছে স্ক্রিন সংকট। বিশেষ করে তারকানির্ভর বড় বাজেটের সিনেমা মাল্টিপ্লেক্সে অগ্রাধিকার পাওয়ায় মাঝারি বাজেটের ছবিগুলো আরও বেশি চাপে পড়তে পারে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল মনে করেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সবাই একসঙ্গে সিনেমা মুক্তির যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে প্রযোজকদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে স্টার সিনেপ্লেক্সের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কোনো সমন্বয় ও পরিকল্পনা ছাড়া এতগুলো সিনেমা একসঙ্গে মুক্তি দেওয়া প্রযোজক ও হল মালিক—উভয়ের জন্যই লোকসানের কারণ হতে পারে। তার মতে, বছরের বেশিরভাগ সময় দর্শক নতুন সিনেমা থেকে বঞ্চিত থাকছেন। এতে যেমন নতুন দর্শক তৈরি হচ্ছে না, তেমনি হল মালিকদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি প্রযোজক, পরিবেশক ও প্রদর্শকদের মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিকল্পিত মুক্তি সূচির ওপর জোর দেন।
মাসুদ রানা সিনেমার প্রযোজক ও পরিবেশক আব্দুল আজিজ মনে করেন, একসঙ্গে এত সিনেমা মুক্তি পাওয়া সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে না। তবে ঈদ দেশের সবচেয়ে বড় সিনেমা মৌসুম হওয়ায় দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য এই সময়টিকেই বেছে নিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে মালিক সিনেমার নির্মাতা সাইফ চন্দন প্রতিযোগিতার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, ঈদের বাইরে বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দেওয়া এখনও কঠিন। চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবাই সহকর্মী হওয়ায় বিষয়টিকে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আবার রইদ সিনেমার নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন পুরো বিষয়টিকে রাজনৈতিক ও বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তার মতে, গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক নির্মাতা উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন। এছাড়া সামনে বিশ্বকাপ ফুটবলসহ নানা বড় আয়োজন থাকায় এই সময়কে তারা উপযুক্ত মনে করেছেন।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা সিনেমা হলের মালিক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ মনে করেন, একই সময়ে এত সিনেমা মুক্তির সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ ঈদের পর নতুন সিনেমার সংকট তৈরি হলে হলগুলোর ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, সিনেমা মুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় কার্যকর কাঠামোর অভাবে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রযোজক, পরিবেশক, নির্মাতা ও হল মালিকদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর রিলিজ কমিটি গঠনের পরামর্শও দিয়েছেন অনেকেই।