ক্ষতিগ্রস্ত যে ২০ মার্কিন সামরিক স্থাপনা ইরানের হামলায় ব্যাপক

Total Views : 15
Zoom In Zoom Out Read Later Print

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এসব সামরিক স্থাপনা অবস্থিত। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিও থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। খবর বিবিসির।

বিবিসির বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, ইরানের হামলার পরিধি যতটা ব্যাপক বলে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একযোগে হামলা চালায়। মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানও ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামারিক স্থাপনায় পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। এতে এসব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ ও রাডার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের হিসাবে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে তারা ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। অথচ হোয়াইট হাউস বারবার দাবি করেছে, ইরানের সামরিক বাহিনীকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন স্থাপনাগুলোতে যে ধরনের ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে, তা থেকে বোঝা যায়, তেহরানের পাল্টা হামলা মার্কিন কর্মকর্তাদের আগের স্বীকারোক্তির চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত ও ব্যাপক ছিল। এ বিষয়ে বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধানের পক্ষ থেকে একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু ‘নিরাপত্তার কারণে’ তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-সংক্রান্ত স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ যুক্তরাষ্ট্র সীমিত করার চেষ্টা করেছে। এ লক্ষ্যে প্রধান স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেটকে তারা ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এলাকার নতুন স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ জানায়। প্ল্যানেট বলেছে, তারা চায় না তাদের স্যাটেলাইট ছবি ‘বৈরী পক্ষের’ হাতে পড়ে মিত্রদেশ ও ন্যাটো-অংশীদার বাহিনী কিংবা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে ব্যবহার করা হোক।

বিবিসি ভেরিফাই ইরানি হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খোঁজখবর রাখতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের স্যাটেলাইট চিত্রের পাশাপাশি প্ল্যানেটের পুরোনো ছবি ব্যবহার করেছে।

বিবিসি ভেরিফাই যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, কোনো কোনো বিশ্লেষক এ সংখ্যা ২৮ পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত মূল্যবান লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আরব আমিরাতের আল রুওয়াইস ও আল সাদার এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা তিনটি অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যাটারি সিস্টেম রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের মাত্র আটটি ‘টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড ব্যাটারি রয়েছে বলে জানা যায়, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে মোতায়েন করা আছে। এ ব্যবস্থা তৈরি করতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার (১ বিলিয়ন ডলার) খরচ হয়। প্রতিটি ব্যাটারি পরিচালনায় প্রায় ১০০ সেনার একটি দল প্রয়োজন হয়। আর এটি থেকে উৎক্ষেপণ করা প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ (প্রায় ১২ দশমিক ৭ মিলিয়ন) ডলার।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ভূস্থানিক ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মায়ারের (এমএআইএআর) একজন বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিগ্রস্ত একটি বিমানকে ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ নজরদারি বিমান হিসেবে শনাক্ত করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি প্রতিস্থাপন করতে ৭০ কোটি (৭০০ মিলিয়ন) ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

অন্য জায়গার মধ্যে কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প আরিফজানেও হামলা চালিয়েছে ইরান। সংঘাতের সময়ে একাধিকবার আক্রান্ত হওয়া আলী আল সালেম ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্রে জ্বালানি মজুত রাখার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংকার, বিমানের হ্যাঙ্গার ও সেনাদের থাকার জায়গা শনাক্ত করেছেন মায়ারের বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি জেনস ক্যাম্প আরিফজানে স্যাটেলাইট যোগাযোগ যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক কেলি গ্রিকো বলেন, “শুরুর দিকে ইরানের হামলাগুলো মূলত সংখ্যার দিক থেকে বেশি ছিল। ব্যাপক সংখ্যার মাধ্যমে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত করার জন্য এভাবে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে কয়েক দিনের মধ্যে ইরান আরও ছোট ও নিখুঁত লক্ষ্যমুখী আক্রমণের দিকে চলে যায়। নির্দিষ্ট উচ্চ মূল্যের লক্ষ্যবস্তুর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বাঁচিয়ে রেখে তারা এমন সব জায়গায় আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করে, যেখানে এগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে কাছাকাছি পড়লেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত হয়।”

গ্রিকো সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে এবং আবার যুদ্ধ শুরু হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বর্তমান ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাগুলো সে ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংঘাতের ফলে মার্কিন ও তার অংশীদারদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে শেষ হয়ে গেছে। এই মজুত দ্রুত পূরণ করার কোনো সহজ উপায় নেই। এর অর্থ হলো, ইরান যদি নতুন করে হামলা চালায়, তবে সংঘাতের শুরুর দিকে (যুক্তরাষ্ট্রের) যে পরিমাণ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, এবার সেটার মাত্র সামান্য অংশ দিয়ে তা মোকাবিলা করতে হবে।’

মার্কিন স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে মে মাসে পেন্টাগনের একটি আনুমানিক হিসাবে অপারেশন এপিক ফিউরির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার (২৯ বিলিয়ন ডলার)। পেন্টাগনের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪২টি বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে এফ-১৫ ও এফ-৩৫ ফাইটার জেট, ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং একটি এ-১০ অ্যাটাক প্লেন রয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ব্যয়বহুল যুদ্ধাস্ত্রের তুলনায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে কম দামি ও সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য ড্রোন ব্যবহার করেছে। বিবিসি ভেরিফাইয়ের সঙ্গে আলাপকালে বিশেষজ্ঞরা জানান, সংঘাত চলাকালে ইরানের যুদ্ধকৌশল পরিবর্তিত হয়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শহর ও ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ঢালাওভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পথ থেকে সরে এসে আরও নিখুঁত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী হামলার দিকে এগিয়েছে।

See More

Latest Photos