প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে হেনস্তা,দিল্লিতে

Total Views : 15
Zoom In Zoom Out Read Later Print

কূটনৈতিক সম্পর্ক কেবল দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আনুষ্ঠানিক করমর্দনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার। কিন্তু সম্প্রতি দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের আচরণ সেই শিষ্টাচারের ভয়াবহ লঙ্ঘন। ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে অংশ নিতে যাওয়া একজন ভিআইপি মর্যাদার ব্যক্তিত্বকে আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখা কেবল অসৌজন্যমূলকই নয়, বরং অত্যন্ত উদ্বেগজনকও।

রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসাবে ডা. জাহেদ উর রহমানের এ সফরের বিষয়ে কূটনৈতিক পত্রের (নোট ভারবাল) মাধ্যমে ভারতকে আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছিল। এমনকি বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। তার পাসপোর্টে বৈধ সার্ক ভিসা স্টিকার থাকা সত্ত্বেও তথাকথিত ‘নিরাপত্তা নজরদারি তালিকা’ বা ‘ওয়াচলিস্টের’ অজুহাতে তাকে যেভাবে হেনস্তা করা হলো, তা কোনো সাধারণ আমলাতান্ত্রিক ভুল হতে পারে না। এ ঘটনা স্পষ্টতই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিনা, সেই গুরুতর প্রশ্নটি এড়ানো যায় না। নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে ডা. জাহেদ উর রহমান যেভাবে তাৎক্ষণিকভাবে সফর বাতিল করে দেশে ফিরে আসার অনড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। তিনি ব্যক্তিগত অসম্মানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নে রূপ দিয়ে দেশের আত্মসম্মান সমুন্নত রেখেছেন। ভারতের অনুরোধ সত্ত্বেও তার এই ফিরে আসা ছিল একটি নীরব ও শক্ত প্রতিবাদ।

পুশইন নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে বিদ্যমান অস্বস্তির মাঝেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে আরেক দফা শীতলতায় ঠেলে দিল। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, যা ছিল সঠিক ও জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ। তবে একে কেবল ‘দুঃখজনক’ বা ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বিশ্লেষকরা যথার্থই বলেছেন, সব ধরনের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও এ ধরনের ঘটনা একাধারে উসকানিমূলক এবং এক ধরনের কূটনৈতিক ‘স্যাবোটাজ’। এটি দুই দেশের চলমান সম্পর্কের গভীরতা ও ভারতের সদিচ্ছাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সবসময়ই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এই দুঃখজনক আচরণ থেকে প্রশ্ন জাগে, দিল্লি আসলে ঢাকার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চায় এবং বাংলাদেশকে কোন চোখে দেখছে? একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতাকে এভাবে অপমান করার পর দিল্লির নীরবতা বা দায়সারা রুটিন তল্লাশির অজুহাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতকে অবশ্যই এই অসৌজন্যমূলক আচরণের আনুষ্ঠানিক ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভবিষ্যতে যেন এমন শিষ্টাচারবহির্ভূত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করার দায় এখন পুরোপুরি দিল্লির। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ঢাকাকে এই প্রশ্নে কড়া অবস্থানে অনড় থাকতে হবে এবং নিজেদের সার্বভৌম মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে কূটনৈতিক দরকষাকষিতে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।

See More

Latest Photos