কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। ফ্রান্সের জি-৭ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফার একটি খসড়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির আওতায় আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়েছে। তবে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে। এই সমঝোতা প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তিনটি বড় হুমকি চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থায়ী শান্তির হাতছানি নাকি সাময়িক বিরতি: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ভবিষ্যৎ কী
লেবানন পরিস্থিতির জটিল সমীকরণ: শান্তি আলোচনার অন্যতম শর্ত ছিল সব রণাঙ্গনে সামরিক অভিযান বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতির কথা বললেও, ইসরায়েল লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এই চুক্তির কোনো শর্ত নয় এবং ইসরায়েল আত্মরক্ষার অধিকার বজায় রাখবে। অথচ ইরান ও হিজবুল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, লেবানন ইস্যু ছাড়া শান্তি আলোচনা পূর্ণতা পাবে না। বিশ্লেষক ড. এইচ. এ. হেলিয়ার মনে করেন, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান কূটনৈতিক এই অগ্রগতির সবচেয়ে বড় বাধা। ইরান সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তা ভেস্তে যেতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ও সমৃদ্ধকরণের বিতর্ক: চুক্তিতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্যমতে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুদ আছে। খসড়া অনুযায়ী, ইরান ইউরেনিয়ামের মান কমিয়ে (ডাউনব্লেন্ডিং) আইএইএ-এর তদারকিতে নিয়ে আসার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। তবে এই মজুদ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাকি। ডারিন সেলনিকের মতো বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি আবারও অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম তৈরির পথে হাঁটে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক অভিযান শুরুর হুমকি বাস্তব রূপ নিতে পারে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও টোল বিতর্ক: বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ যাতায়াত করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফেব্রুয়ারি থেকে এই নৌপথ প্রায় অচল হয়ে আছে। চুক্তি অনুযায়ী, শুক্রবারের পর থেকে এই পথটি পুনরায় টোলমুক্ত হিসেবে খোলার কথা। কিন্তু তেহরান ইতিমধ্যে সংকেত দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে তারা জাহাজ চলাচলের ওপর সেবা ফি বা টোল আরোপ করতে চায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নিতে রাজি নয়, যা টোলমুক্ত যাতায়াতকে সীমিত করে। এছাড়া, মাইন অপসারণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো প্রযুক্তিগত কাজ শেষ করতে বেশ কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। শিপিং কোম্পানিগুলোও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে এখনো দ্বিধাগ্রস্ত।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৪ দফার এই খসড়া কেবল আলোচনার একটি কাঠামো মাত্র। এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং কঠিন যাত্রার সূচনা মাত্র। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষ কতটা নমনীয়তা দেখায়, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে এই শান্তি প্রক্রিয়া টিকে থাকবে কি না।