যে শহরে একবার এক কিংবদন্তির সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল, সেই একই শহরে ৩২ বছর পর তারই উত্তরসূরি একই রাতে দুটো বিপরীতমুখী রেকর্ড গড়ে ফেললেন। যে দিনে সে কিংবদন্তি উঠে গিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়, ৪০ বছর পর সে একই দিনে সে উত্তরসূরি ফেরালেন তার স্মৃতিকে! দিয়েগো ম্যারাডোনা আর লিওনেল মেসি; দুই গুরু শিষ্যকে একই বাক্যে কিংবদন্তি, সর্বকালের সেরা বলে মানেন অনেকেই। তবে তাদের দুজনের গল্পও যেন ক্ষণে ক্ষণে মিলে যায়! ডালাসে গত ২২ জুন রাতেও দুজনের পাণ্ডুলিপি যেন মিলে গেল অনেকটাই! ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন। ‘ওরা তো আমার পা দুটো কেটেই ফেলল!’ — এই কথামালা বেরিয়ে এসেছিল খোদ আর্জেন্টাইন নায়ক দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার কণ্ঠ থেকে। আর্জেন্টিনা তো অতি অবশ্যই, এই কথাগুলো বিশ্বকেও তো থমকে দিয়েছিল!
২ স্মৃতিকে ফেরালেন মেসি ২ রেকর্ডে যেভাবে ম্যারাডোনার আনন্দ-বেদনার
সু অ্যালেন কার্পেন্টার নামের এক নার্স মাঠ থেকে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে। উদ্দেশ্য ছিল ডোপ টেস্ট। সেই টেস্টের ফলাফল এল এফেড্রিন পজিটিভ। যার শাস্তি হিসেবে তিনি পেলেন ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা। সঙ্গে সঙ্গে একটা স্বপ্নের কফিনেও যেন শেষ পেরেকটা ঠোকা হয়ে গেল।
আর্জেন্টিনার এক সোনালী প্রজন্মের শেষ আর আরেক প্রজন্মের শুরু দেখছিল সে বিশ্বকাপ। রেডন্ডো, বাতিস্তুতা, কানিজিয়া, বালবোদের নিয়ে গড়া সেই দলের সঙ্গে ছিলেন নায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা। দুয়ের মেলবন্ধনে আর্জেন্টিনা দেখছিল তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। সে স্বপ্ন এক পলকেই চুরমার। ম্যারাডোনা-বিহীন আর্জেন্টিনা এরপর ডালাসেই বুলগেরিয়ার কাছে হারে, তারপর শেষ ষোলোতে রোমানিয়ার কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায়।
৩২ বছর পরের এক কাঠফাটা রোদ্দুরের দিন। ২২ জুন, ২০২৬। শহরটা একই, এবার রঙ্গমঞ্চটা বদলে গেল। এবারের ভেন্যু আর্লিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম। এবার আরেকটু হলে অন্য এক নায়কের বধ্যভূমি বনেই যাচ্ছিল এই মাঠ। লিওনেল মেসি অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করে বসলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে যা হয়ে থাকল সর্বোচ্চ সংখ্যক পেনাল্টি মিসের রেকর্ড।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হলো না আরেক কারণে। কারণ তারিখটাতে খেয়াল করুন এবার। এটা সেই দিন ৪০ বছর আগে যে তারিখে ম্যারাডোনা উঠে গিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে এই ২২ জুনই তিনি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিলেন ‘হ্যান্ড অফ গড’ আর ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’; সেটাও আবার ৪ মিনিটের এদিক ওদিকে।
অমরত্বের খাতায় নাম লেখানোর জন্য মেসি যেন সে দিনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। পেনাল্টি মিস করে ম্যারাডোনার ডালাস স্মৃতিকে উসকে দিয়েছিলেন। এরপর দারুণ দুটো গোল করে তিনি যেন একটা ট্রিবিউট দিলেন ম্যারাডোনার ২২ জুনের সে ইতিহাসকে।
শুধুই যদি গোল হতো, তাহলে ট্রিবিউট কথাটা মোটেও মানানসই হতো না বোধ করি। মেসি এই দুই গোলের প্রথমটিতে উঠে গেছেন ইতিহাসের পাতায়। ১৭ গোল করে তিনি পেছনে ফেলেছিলেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে। জোড়া গোলে স্মরণটা তাই নেহায়েত স্মরণে আটকে রইল না, রূপ নিল নৈবেদ্যে।