স্পিকারের সামনে বাংলাদেশকে উদ্দেশ্য করে আয়াত তেলাওয়াত খামেনির শোকানুষ্ঠানে , এর অর্থ ও ব্যাখ্যা কী?

Total Views : 11
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় দাফন ও শোকানুষ্ঠান শুক্রবার শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি ইরানে পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি। শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিদেশি প্রতিনিধিদলের জন্য স্বতন্ত্রভাবে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত তেলাওয়াত করা হয়। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) উপস্থিত হলে তাদের উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়। বিষয়টি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। শনিবার (৪ জুলাই) রাতে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এ বিষয়ে একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করে ফেসবুকে দাবি করেন, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কোরআনের আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে পৃথক বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মত দিয়েছেন।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জানাজায় অংশ নিতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল উপস্থিত হলে তাদের সামনে পৃথক পৃথক আয়াত তেলাওয়াত করা হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে সূরা আল-আহযাবের ২৩ নম্বর (مِنَ الۡمُؤۡمِنِيۡنَ رِجَالٌ صَدَقُوۡا مَا عَاهَدُوا اللّٰهَ عَلَيۡهِ​ۚ فَمِنۡهُمۡ مَّنۡ قَضٰى نَحۡبَهٗ وَمِنۡهُمۡ مَّنۡ يَّنۡتَظِرُ​ ۖ  وَمَا بَدَّلُوۡا تَبۡدِيۡلًا ۙ‏) আয়াত তেলাওয়াত করা হয়।

আয়াতটির বাংলা অর্থ হলো— ‘মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। তাদের কেউ কেউ (শাহাদাতবরণ করে) নিজেদের শপথ পূর্ণ করেছে, আর কেউ কেউ (শাহাদাতের) প্রতীক্ষায় আছে। এবং তারা তাদের অঙ্গীকারে সামান্যতমও পরিবর্তন করেনি।’

জুলকারনাইন সায়ের তার পোস্টে উল্লেখ করেন, আয়াতের ‘ফামিনহুম মান কাদা নাহবাহু’ অংশের তাফসিরে কয়েকটি মত রয়েছে।

একটি মতে, আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূরণ করে কেউ শহীদ হয়েছেন। আরেকটি মতে, কেউ জীবদ্দশায় সেই অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন এবং তা থেকে বিচ্যুত হননি। অন্য একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ আয়াতে সাহাবায়ে কিরামের প্রশংসা করা হয়েছে এবং আনাস (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসের আলোকে বলা হয়, ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হওয়া আনাস ইবনে নাদর (রা.)-কে কেন্দ্র করেই এ আয়াত নাজিল হয়েছিল।

একই পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের জন্যও ভিন্ন ভিন্ন কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়েছে।

সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলের সামনে সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, যেখানে বদর যুদ্ধে মুখোমুখি হওয়া দুই দলের প্রসঙ্গ এসেছে।

তুরস্কের প্রতিনিধিদলের সামনে সূরা আন-নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়, যেখানে জিহাদকারীদের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।

তিনি আরও লেখেন, লেবাননের প্রতিনিধিদের সামনে সূরা মুহাম্মাদের ৩৭-৩৮ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, যেখানে ত্যাগের আহ্বান ও কৃপণতার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

হিজবুল্লাহ প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে সূরা আলে ইমরানের ১৩৯ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়, যাতে বলা হয়েছে ‘দুর্বল হয়ো না, দুঃখিতও হয়ো না; তোমরাই শ্রেষ্ঠ, যদি তোমরা মুমিন হও।’

জুলকারনাইন সায়েরের দাবি অনুযায়ী, ‘ইয়েমেনের হুথি প্রতিনিধিদের সামনে সূরা আলে ইমরানের ১৪৬ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, যেখানে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে দুর্বল না হওয়ার প্রশংসা করা হয়েছে।

আর কাতারের প্রতিনিধিদলের সামনে সূরা আলে ইমরানের ১৫২ নম্বর আয়াতের শেষাংশ পাঠ করা হয়, যাতে ক্ষমা ও আল্লাহর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি মনে করেন, এটি দেশটির মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে ইঙ্গিত করতে পারে।’

এদিকে, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব ড. মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, কোরআনের সূরা আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে— ‘মিনাল মুমিনীনা রিজালুন সাদাকু মা আহাদুল্লাহা আলাইহি; ফামিনহুম মান কাদা নাহবাহু ওয়া মিনহুম মান ইয়ানতাজির; ওয়া মা বাদ্দালু তাবদিলা।’

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ঈমানদারদের মধ্যে এমন একটি দল থাকবে, যারা আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূরণ করবে এবং করে যাবে। আল্লাহ তাআলা যখন রূহের জগতে ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’ বলে প্রশ্ন করেছিলেন, তখন সব মানুষই স্বীকার করেছিল ‘আপনিই আমাদের রব।’

অর্থাৎ আল্লাহই একমাত্র আইনদাতা, বিধানদাতা, রিজিকদাতা ও সবকিছুর মালিক। এই অঙ্গীকারে অবিচল থাকা ঈমানদারদের একটি অংশ আল্লাহর দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে শহীদ হবে এবং আরেকটি অংশ শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেই পথেই অটল থাকবে।

তিনি বলেন, যারা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন, আল্লাহর বিধান ও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেন, তারা শিরকমুক্ত, বিদআতমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, অপরাধমুক্ত, মাদকমুক্ত ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। তাদের মধ্যে কেউ শহীদ হন, আবার কেউ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।

ড. খলিলুর রহমান মাদানী আরও বলেন, বাংলাদেশে ইসলামের জন্য কাজ করতে গিয়ে একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে রাবেতার এক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই আয়াত হয়তো সেই সময়ের ঘটনা নিয়েও আমাদের একটি বার্তা দিতে পারে।


আবার ইরানের সরকার বর্তমান একাই যুদ্ধে লড়েছেন। আগামীতে তারা বাংলাদেশকে তাদের সঙ্গে দেখার জন্য হয়তো একটি বার্তা দিতে আয়াতটি তারা নির্বাচন করতে পারেন। কারণ, যারা এক কালিমায় বিশ্বাসী মুসলমান, তারা বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, একই বিশ্বাসের অনুসারী। একদল ইতোমধ্যে শহীদ হয়েছেন এবং আরেকদল শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেই পথেই অটল থাকবেন।

তিনি বলেন, আমার মনে হয় ইরান প্রতিটি দেশের নিজ নিজ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একটি করে আয়াত তিলাওয়াত করেছে।

See More

Latest Photos