এশিয়ার বাজারে নিজেদের অপরিশোধিত তেলের দাম গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অঙ্কের কমিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। তবে এত বড় ছাড়ের পরও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় সৌদির তেল এখনও ব্যয়বহুল রয়ে গেছে। ফলে এশিয়ার ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সৌদির তেল কেনার ব্যাপারে তেমন একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সোমবার (৬ জুন) রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি সৌদি আরামকো তাদের ফ্ল্যাগশিপ ‘আরব লাইট’ ক্রুডের অফিশিয়াল সেলিং প্রাইস আগামী আগস্ট মাসের জন্য এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ১১ ডলার কমিয়েছে। নতুন এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ওমান ও দুবাইয়ের গড় দামের চেয়ে ১.৫০ ডলার কমে। একই সঙ্গে অপর চারটি গ্রেডের তেলের দামও ব্যারেল প্রতি ১১ ডলার করে কমানো হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং তেলের লোডিং পুনরায় সচল হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণেই বিশ্ববাজারে তেলের দামে আকস্মিক পতন ঘটেছে।
তেলের দামে নজিরবিহীন মূল্যছাড় এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য সৌদির
এর আগে মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, কারণ বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশই এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় এশিয়ার বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি এখন চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলোর বাইরেও তাদের পুরোনো এশীয় ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, ইরাকের সোমো এবং কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনও ক্রেতা আকর্ষণের জন্য তেলের দামে ব্যাপক ছাড় দিচ্ছে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ায়, বিশেষ করে চীনে তেলের দুর্বল চাহিদা এবং ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কারণে বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, যা বাজারকে সম্পূর্ণ ক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে।
এশিয়ার বিভিন্ন শোধনাগার এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, আগস্ট মাসে লোড হতে যাওয়া সৌদি তেলের দাম অন্যান্য উপসাগরীয় গ্রেডের চেয়ে এখনও ব্যারেল প্রতি কয়েক ডলার বেশি পড়বে। এর বড় একটি কারণ হলো পারস্য উপসাগরের ভেতর থেকে তেল পরিবহনের উচ্চ জাহাজ ভাড়া এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখনও বেশ ভঙ্গুর। ফলে পারস্য উপসাগরের ভেতরে প্রবেশ করে তেলবাহী জাহাজ চার্টার করার খরচ অনেক বেশি। ভারতের একটি শোধনাগারের সূত্র জানায়, তারা অন্যান্য কোম্পানির তেল আরও অনেক কম দামে পাচ্ছেন, তাই সৌদির তেল বেশি দামে কেনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
অন্য এক ব্যবসায়ী জানান, আবুধাবির আপার জাকুম ক্রুড ওমানের সোহার বন্দরে জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরের জন্য দুবাই রেটের চেয়ে ৬ থেকে ৮ ডলার কমে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সৌদির রাস তানূরা বন্দর থেকে তেল লোড করতে জাহাজ ভাড়াই ডাবলের চেয়ে বেশি পড়ে যাচ্ছে।
হিসাব অনুযায়ী, উপসাগরের ভেতর থেকে তেল আনা বাইরের চেয়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১৫ ডলার বেশি ব্যয়বহুল। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সৌদি আরব এখনই কোনো মূল্য যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছে না। তারা কৃত্রিমভাবে তেলের দাম ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এক তেল ব্যবসায়ী মন্তব্য করেছেন যে সৌদিরা ভালো করেই জানে তাদের তেলের দাম এখন বেশি, তবুও তারা দাম ধরে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বাজার পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে দাম আরও না কমালে এশিয়ার বাজারে বড় ধরনের মার্কেট শেয়ার হারাতে পারে সৌদি আরামকো।
সূত্র: রয়টার্স।