সরকারের ভরসা ট্রেজারি বন্ডেই , বাড়ছে ব্যাংকের বিনিয়োগ

Total Views : 20
Zoom In Zoom Out Read Later Print

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বাজেট ঘাটতি পূরণে আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভর করা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ওপর। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগও ক্রমেই সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও অন্যান্য সরকারি সিকিউরিটিজে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে সরকারের অর্থায়নের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে সরকারি বন্ড বাজার। ‎বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ তথ্য দেখা গেছে। ‎খাত-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, র মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও পরিকল্পিত করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে পুনঃঅর্থায়নের চাপ কমে। তবে একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ যদি অতিমাত্রায় সরকারি সিকিউরিটিজে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পঋণের প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বাজেট অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অর্থায়নের ভারসাম্য বজায় রাখাও নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ‎কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নিট ১ লাখ ৪ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ সরকারি ট্রেজারি বন্ড (বিজিটিবি) থেকেই এসেছে ৬৪ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার বেশি, যা ব্যাংক থেকে নেওয়া মোট নিট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি। একই সময়ে ট্রেজারি বিল থেকে এসেছে আরও ১৮ হাজার ৮২২ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক (বিজিআইএস) থেকে ১২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যান বলছে, সরকার এখন স্বল্পমেয়াদি ধার নেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। পাঁচ, দশ, পনেরো ও বিশ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ হয়েছে। এর মধ্যে ১০ বছর মেয়াদি বন্ডে নিট ২৩ হাজার ৭৪৯ কোটি, ২০ বছর মেয়াদি বন্ডে ১৭ হাজার ৭৬৫ কোটি এবং ৫ বছর মেয়াদি বন্ডে ১০ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

‎বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণই ছিল সরকারি সিকিউরিটিজ ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ। বিপরীতে জাতীয় সঞ্চয়পত্রসহ অ-ব্যাংক উৎস থেকে ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

‎বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের পরিবেশে ট্রেজারি বন্ড এখন ব্যাংকগুলোর কাছে আকর্ষণীয় বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। কারণ এসব বন্ডে ঝুঁকি প্রায় শূন্য এবং নির্ধারিত সময়ে সরকার সুদ ও মূলধন পরিশোধের নিশ্চয়তা দেয়। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক ব্যাংক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

 

‎এতে সরকারের জন্য বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন সহজ হলেও অর্থনীতিতে একটি ভিন্ন ধরনের প্রভাব তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকগুলো যদি উৎপাদন ও শিল্প খাতের পরিবর্তে সরকারি বন্ডে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এটিকে 'ক্রাউডিং আউট' প্রভাব বলা হয়।

‎প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা সরকারি ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ও অন্যান্য সরকারি সিকিউরিটিজের স্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু ট্রেজারি বন্ডের স্থিতিই দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ২৫১ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া ট্রেজারি বিলের স্থিতি বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা।

 

‎একই সময়ে শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও সরকারের সক্রিয়তা বেড়েছে। বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুকের (বিজিআইএস) স্থিতি এপ্রিল শেষে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে এই সুকুকের ব্যবহারও বাড়ছে।

‎অন্যদিকে অ-ব্যাংক উৎস থেকে সরকারের অর্থ সংগ্রহ আশানুরূপ হয়নি। জুলাই-এপ্রিল সময়ে সঞ্চয়পত্রে নতুন বিক্রির তুলনায় পরিশোধ বেশি হওয়ায় সরকারকে নিট ৪২৯ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। ফলে বাজেট অর্থায়নের ভার আরও বেশি করে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর পড়েছে।

 

‎প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় সঞ্চয়পত্রে জুলাই-এপ্রিল সময়ে মোট বিক্রি হয়েছে ৭৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে মূলধন পরিশোধ করতে হয়েছে ৭৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ফলে সরকারকে নিট ৪২৯ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। অর্থাৎ নতুন বিক্রির চেয়ে পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের অর্থ সংগ্রহ নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।

‎বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, একক মাসে ঋণ পরিশোধের ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। সরকারি রাজস্ব আদায়, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মেয়াদপূর্তি এবং নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে মাসভিত্তিক ঋণের চিত্র পরিবর্তিত হয়। তবে সামগ্রিক প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে চলতি অর্থবছরে সরকারের অর্থায়নের মূল ভরসা ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

‎বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এর প্রধান কারণ সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ। অন্যদিকে অ-ব্যাংক উৎস থেকে ঋণ গত অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

‎প্রতিবেদনটি আরও ইঙ্গিত করছে, সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ব্যবহার বেড়েছে। এটি একদিকে সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করলেও অন্যদিকে সুদ ব্যয়ের কাঠামো এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই আগামী বাজেটে ঋণের উৎস বৈচিত্র্যময় করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, 'সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকনির্ভর ঋণ দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও বর্তমানে উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কিছুটা দুর্বল, তবুও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরালো হলে ব্যাংকগুলোর তহবিলের ওপর প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এ অবস্থায় বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র, বন্ড বাজার এবং অন্যান্য অ-ব্যাংক উৎসকে আরও কার্যকর করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

See More

Latest Photos