জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতি এক ধরনের অস্বস্তিকর বৈপরীত্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। যে আন্দোলন একসময় কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়েই এখন নতুন রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হচ্ছে। এমনকি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু রাজনৈতিক শক্তি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে তাদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নে চাপ দিতে রাজপথে আবারও অভ্যুত্থানের হুমকি দিচ্ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বিএনপি সরকার তাঁদের প্রত্যাশিত সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে আবারও আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের পথে যাওয়া হতে পারে। অথচ তাঁদের প্রস্তাবিত সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে এখনো পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এখানে প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমায় আটকে নেই। বরং গণতান্ত্রিক আলোচনার জায়গায় রাজপথের শক্তিকে বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর প্রবণতাই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার কোনো রাজনৈতিক দলের হুমকি বা চাপের কাছে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা সমর্পণ করতে পারে না। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান হয় আলোচনা, নির্বাচন, সংসদীয় প্রক্রিয়া ও জনগণের রায়ের মাধ্যমে—রাজপথের ভয় দেখিয়ে নয়। জুলাই অভ্যুত্থান কোনো এক ধরনের রাজনৈতিক নিপীড়ন সরিয়ে তার জায়গায় আরেক ধরনের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘটিত হয়নি। অথচ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আচরণে এমন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে কেউ কেউ নিজেদের এবং নিজেদের দলকে জুলাইয়ের চেতনার একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। এটি জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে বিরোধিতার নতুন সমীকরণ