প্রতি কয়েক বছর পরপরই পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ গঠনের বিতর্ক ফিরে আসে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ছোট প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাম্প্রতিক প্রস্তাবটি এই আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। কিন্তু আসল প্রশ্ন এটা নয় যে পাকিস্তানে কয়টি প্রদেশ থাকা উচিত, বরং প্রশ্নটি হলো, নাগরিকদের কার্যকরভাবে সেবা দেওয়ার জন্য সরকার যথেষ্ট পাশে রয়েছে কি না। পাকিস্তানে প্রশাসনিক সীমানা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিচার, অবকাঠামো ও দুর্যোগ ত্রাণ কত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ধারণ করে। প্রায় ২৪ কোটির বেশি মানুষ এবং প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাবিশিষ্ট পাকিস্তানে গিলগিট-বালতিস্তানের পাহাড়, থারের মরুভূমি এবং বিশাল বেলুচিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। লাহোর বা করাচির জন্য উপযোগী শাসনব্যবস্থা কেচ, আপার কোহিস্তান বা আস্তোরের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। পাকিস্তানের ইতিহাস জাতীয় ঐক্যের সাথে কার্যকর প্রশাসনের ভারসাম্য রক্ষার বারবার প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে। পাকিস্তানের ইতিহাসে জাতীয় ঐক্য ও কার্যকর প্রশাসনের মধ্যে ভারসাম্য আনার একাধিক প্রচেষ্টা দেখা গেছে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধ, নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স, বেলুচিস্তানের চিফ কমিশনারের প্রদেশ, উপজাতীয় এলাকা এবং কালাত, বাহাওয়ালপুর ও সোয়াতসহ বিভিন্ন দেশীয় রাজ্য। ১৯৫৫ সালের ‘ওয়ান ইউনিট’ পরিকল্পনা প্রশাসনকে কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করলেও তা আঞ্চলিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে। ১৯৭০ সালে এর বিলুপ্তি এবং ১৯৭৩ সালের সংবিধান প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে।
শাসনব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা পাকিস্তানে
পরবর্তীতে ফাটা-কে খাইবার পাখতুনখোয়ার সাথে একীভূত করা হলেও দক্ষিণ পাঞ্জাব, হাজারা ও বাহাওয়ালপুরে নতুন প্রদেশের দাবি এখনো অব্যাহত রয়েছে।ক্ষুদ্রতর প্রশাসস গঠনের পক্ষে যুক্তিটি মূলত প্রশাসনিক, রাজনৈতিক নয়।
একদিকে যেমন, পাঞ্জাবের জনসংখ্যা অনেক দেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি, অন্যদিকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের প্রায় ৪৪ শতাংশ ভূখ- জুড়ে বিস্তৃত হলেও এর জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সরকার তখনই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করে, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা তাদের সেবাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি থাকেন। ২০২২ সালের বন্যা দেখিয়েছিল যে শক্তিশালী স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারে।তবে দেশটিতে নতুন প্রদেশ গঠন সহজ বা কম ব্যয়সাপেক্ষ নয়। এর জন্য সাংবিধানিক সংশোধন, রাজনৈতিক ঐকমত্য, নতুন আইনসভা, বিচারিক প্রতিষ্ঠান এবং টেকসই আর্থিক সংস্থান প্রয়োজন। সতর্ক পরিকল্পনা ছাড়া সংস্কার কেবল আমলাতন্ত্রকেই প্রসারিত করবে।
এক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ভারত ছত্তিশগড়, ঝাড়খ-, উত্তরাখ- ও তেলেঙ্গানার মতো নতুন রাজ্য গঠন করেছে। বাংলাদেশ নতুন প্রদেশ না করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী করেছে। ইন্দোনেশিয়া ১৯৯৮ সালের পর ক্ষমতা ও আর্থিক সম্পদের ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। বিপরীতে, নাইজেরিয়া আর্থিক স্থায়িত্ব ছাড়া প্রশাসনিক ইউনিট বাড়ানোর ঝুঁকি দেখিয়েছে, আর ফ্রান্স আঞ্চলিক সীমানা বারবার পরিবর্তন না করে বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে।
পরবর্তীতে ফাটা-কে খাইবার পাখতুনখোয়ার সাথে একীভূত করা হলেও দক্ষিণ পাঞ্জাব, হাজারা ও বাহাওয়ালপুরে নতুন প্রদেশের দাবি এখনো অব্যাহত রয়েছে।ক্ষুদ্রতর প্রশাসস গঠনের পক্ষে যুক্তিটি মূলত প্রশাসনিক, রাজনৈতিক নয়।
একদিকে যেমন, পাঞ্জাবের জনসংখ্যা অনেক দেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি, অন্যদিকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের প্রায় ৪৪ শতাংশ ভূখ- জুড়ে বিস্তৃত হলেও এর জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সরকার তখনই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করে, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা তাদের সেবাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি থাকেন। ২০২২ সালের বন্যা দেখিয়েছিল যে শক্তিশালী স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারে।তবে দেশটিতে নতুন প্রদেশ গঠন সহজ বা কম ব্যয়সাপেক্ষ নয়। এর জন্য সাংবিধানিক সংশোধন, রাজনৈতিক ঐকমত্য, নতুন আইনসভা, বিচারিক প্রতিষ্ঠান এবং টেকসই আর্থিক সংস্থান প্রয়োজন। সতর্ক পরিকল্পনা ছাড়া সংস্কার কেবল আমলাতন্ত্রকেই প্রসারিত করবে।
এক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ভারত ছত্তিশগড়, ঝাড়খ-, উত্তরাখ- ও তেলেঙ্গানার মতো নতুন রাজ্য গঠন করেছে। বাংলাদেশ নতুন প্রদেশ না করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী করেছে। ইন্দোনেশিয়া ১৯৯৮ সালের পর ক্ষমতা ও আর্থিক সম্পদের ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। বিপরীতে, নাইজেরিয়া আর্থিক স্থায়িত্ব ছাড়া প্রশাসনিক ইউনিট বাড়ানোর ঝুঁকি দেখিয়েছে, আর ফ্রান্স আঞ্চলিক সীমানা বারবার পরিবর্তন না করে বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে।
ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এসব দেশের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে, সফল প্রশাসনিক সংস্কার নির্ভর করে প্রশাসনিক ইউনিটের সংখ্যার ওপর নয়; বরং ক্ষমতা, অর্থায়ন ও জবাবদিহি বাস্তবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছেছে কি না, তার ওপর।পাকিস্তানের সংবিধানের ১৪০এ অনুচ্ছেদ নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের সাংবিধানিক ভিত্তি দিয়েছে। ২০০১ সালের স্থানীয় সরকার পরিকল্পনা এর সুফল দেখিয়েছিল। তবে ১৮তম সংশোধনীর পর বিকেন্দ্রীকরণ অনেক ক্ষেত্রেই প্রাদেশিক পর্যায়ে থেমে গেছে।
যেখানে জনমত, প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিদ্যমান, সেখানে নতুন প্রদেশ একটি সাংবিধানিক বিকল্প হিসেবে থাকা উচিত। একই সাথে, প্রদেশগুলোর উচিত অনুমানযোগ্য তহবিল, নিয়মিত নির্বাচন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি, স্যানিটেশন ও স্থানীয় অবকাঠামোর উপর বৃহত্তর কর্তৃত্বের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারগুলোকে শক্তিশালী করা।প্রায় আট দশক পর, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এটাই বলে যে, সীমানার চেয়ে প্রতিষ্ঠানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়া উচিত এবং দেশজুড়ে নাগরিকরা যেন দ্রুত সাড়া প্রদানকারী সরকারি পরিষেবা পান, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একটি ফেডারেশনের প্রকৃত শক্তি তার প্রদেশের সংখ্যায় নয়, বরং জনগণের এই আস্থায় নিহিত যে, তাদের সেবা করার জন্য সরকার কখনোই খুব দূরে নয়।