এআই.মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে , নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে?

Total Views : 28
Zoom In Zoom Out Read Later Print

সিলিকন ভ্যালিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। অনেকে বিষয়টিকে বলেছেন, ‘সিঙ্গুলারিটির পাদদেশে স্বাগতম।’

সহজভাবে বললে, এমন একটি পর্যায় আসতে পারে যখন এআই নিজেই পরবর্তী প্রজন্মের এআইকে প্রশিক্ষণ দেবে। এর ফলে প্রযুক্তির উন্নতি দ্রুতগতিতে বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে এআই মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে।

এ ধরনের সম্ভাবনাকে কেউ দেখছেন আশীর্বাদ হিসেবে, আবার কেউ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে। ইলন মাস্কের মতে, এআই মানবজাতিকে ‘অসাধারণ প্রাচুর্যের যুগে’ নিয়ে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, মানুষকে হত্যাকারী রোবটের হাতে ধ্বংস হওয়ার ১০ থেকে ২০ শতাংশ সম্ভাবনাও রয়েছে।

অন্যদিকে এআইয়ের অন্যতম পথিকৃৎ জিওফ্রি হিন্টনের আশঙ্কা আরও গভীর। ২০২৩ সালে তিনি বলেছিলেন, তার ধারণা মানুষ শেষ পর্যন্ত বিপদে পড়বে। সুপারইন্টেলিজেন্স বা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে এই হিসাবের নির্ভুলতা নিয়ে তিনিও নিশ্চিত নন।

অবশ্য এসব আশঙ্কা ভুলও হতে পারে। কিন্তু যদি তা হয়, তাহলে এআইয়ের ব্যাপক অগ্রগতির ওপর বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধাক্কা আসতে পারে। আর যদি আশঙ্কাগুলো সত্যি হয়, তাহলে বিপদ আরও বড়। তাই সতর্কতার স্বার্থেই এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে এখনই চিন্তা করা জরুরি।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং থেকে শুরু করে ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশ—অনেক বিশ্বনেতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানই এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে কথা বলছেন। শি জিনপিং বলেছেন, এআইকে সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। চীন এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ গঠনের উদ্যোগও নিয়েছে।

ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এআই নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ নিতে বড় ধরনের কোনো সংকট প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

এআই নিয়ে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ধরনও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাইবারসিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সির সাবেক প্রধান জেন ইস্টারলি সতর্ক করেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এমন একটি বড় ঘটনা ঘটতে পারে, যার বাস্তব প্রভাব পড়বে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর।

ইতোমধ্যে এআই এজেন্টগুলোর কিছু আচরণ বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটার তৈরি কিছু এআই এজেন্ট তাদের নির্ধারিত ডিজিটাল সীমার বাইরে গিয়ে ইন্টারনেটের বিভিন্ন বাহ্যিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে হ্যাকিংয়ের চেষ্টা করেছে। একটি ঘটনায় ওপেনএআইয়ের এজেন্টগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে একটি ‘সোয়ার্ম’ বা দল গঠন করেছিল বলে জানা গেছে।

যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় অ্যানথ্রপিকের ‘মাইথস’ মডেল একটি ওপেন সোর্স প্রকল্পে ক্ষতিকর কোড ঢোকানোর চেষ্টা করে। এমনকি মানুষের পরিচয় নকল করে একজন পর্যালোচককে সেই কোড অনুমোদনে চাপ দেওয়ার চেষ্টাও করেছিল। এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য এআই এজেন্ট প্রতারণা, চাপ প্রয়োগ বা অন্য কৌশল ব্যবহার করতে পারে।

এআই বিশেষজ্ঞ হিন্টনের মতে, মানুষ এআইকে যে লক্ষ্যই দিক না কেন, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য এআই নিজে থেকেই বেশি ক্ষমতা অর্জনকে প্রয়োজনীয় উপায় হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এআই নির্মাতারাও সবসময় জানেন না তাদের তৈরি মডেল কীভাবে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে।

এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এআই খাতের এক হাজারের বেশি ব্যক্তি উন্নত এআই তৈরির গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না করে এআই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়।

কিন্তু এখানেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব। একদিকে এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিপুল ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলছে প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। ফলে কোনো দেশ বা কোম্পানি পিছিয়ে পড়তে চাইবে না।

এখানে পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাসের সঙ্গে এআইয়ের পার্থক্য স্পষ্ট। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি প্রথমে কয়েকটি দেশের কঠোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পরও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি হতে প্রায় ২৫ বছর লেগেছিল। এরপরও ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল ও উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে। তবে ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার হয়নি। হিরোশিমার ভয়াবহতা একটি বড় ধরনের নিষেধ বা ‘ট্যাবু’ তৈরি করতে পেরেছে।

এআইয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে যেন একই সময়ে বহু কোম্পানি আলাদা আলাদা ‘ম্যানহাটন প্রকল্প’ চালাচ্ছে এবং সবাই দ্রুত এগিয়ে যেতে চাইছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাও এই ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এআই বিপর্যয় ঘটলেও তার প্রভাব বিশ্বের সব দেশ, কোম্পানি ও মানুষের ওপর সমানভাবে পড়বে না। ফলে একটি বড় দুর্ঘটনাই হয়তো বিশ্বকে একসঙ্গে বসে এআই নিয়ন্ত্রণে বাধ্য করবে না।

তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—হিরোশিমার মতো ভয়াবহ কোনো এআই বিপর্যয় ঘটলেও কি মানবজাতি নিজেদের তৈরি অতিমানবীয় প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে এক হবে? বাস্তবতা বলছে, সেই আশাও হয়তো খুব বেশি করা যাচ্ছে না।

See More

Latest Photos