কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করে অবৈধ আবাসন প্রকল্প পরিচালনার অভিযোগ। ডেসটিনি খ্যাত প্রতারকদের বিরুদ্ধে ভূমি জালিয়াতি ও অর্থ পাচাঁরের অভিযোগ। আবাসন মাফিয়াদের দৌরাত্ম খুঁটির জোর কোথায়?
আবাসন প্রকল্পের নামে ভূমি প্রতারণা, ওয়েস্টার্ন ভ্যালীর বিরুদ্ধে রাজউক কর্তৃক অভিযান।
দেশের মানুষ যখন পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় ব্যাস্ত ঠিক তখনই একদল ভূমি খেকোরা ফসলী জমি দখলের চেষ্টায় লিপ্ত।
অভিযোগ রয়েছে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে দলীয় নেতাকর্মীদের হাত করে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র মেতেছিলো ভূমি গ্রাসের মত জঘন্য অপরাধে।
ঢাকার আশপাশের উপজেলা গুলো বেশিরভাগ ভূমি গ্রাসের শিকার হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
উল্লেখযোগ্য ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ জেলার বেশ কয়েকটি
এলাকার সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ এলাকা ভূমি গ্রাসের কবলে পড়ে। এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্পের নামে ভূমি প্রতারণার ফাঁদ।
সাভারে অবস্থিত ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালী নামক আবাসন প্রকল্প। প্রকল্পটির বিরুদ্ধে রয়েছে অজস্র অভিযোগ, এসব অভিযোগে কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।
কোম্পানির মালিকানায় রয়েছে ডেসটিনি খ্যাত প্রতারক ম্যানেজিং ডিরেক্টর সৈয়দ আলীনুর ইসলাম যিনি আবাসন ব্যবসা থেকে কোটি কোটি টাকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশে পাচাঁর করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সৈয়দ আলীনুর একাধিক বিয়ে করে তাদের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে বলে জানা গেছে। তিনজন স্ত্রীর একজন আমেরিকায় অন্যজন অস্ট্রেলিয়ায়, বড় স্ত্রী বাংলাদেশে বসবাস করেন। সৈয়দ আলীনুর এর সম্পদের বেশিরভাগ মালিকানায় স্ত্রীদের নাম ব্যবহার করেন। এভাবেই তিনি ভূমি জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের টাকা বিদেশে পাচাঁর করে যাচ্ছেন যার তদন্ত প্রয়োজন।
আরেকজন ব্যাংক কর্মকর্তা নাম মহিউদ্দিন খাঁন যিনি কোম্পানির ভাইস-চেয়াম্যান ভূমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হস্তগত হওয়ায় লোভের বশিভূত হয়ে ব্যাংকের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে বেছে নেন ভূমি জালিয়াতির পথ। অভিযোগ রয়েছে তিনি মালয়েশিয়ায় টাকা পাচাঁর করে সেখানে বাড়ি গাড়ি রেস্টুরেন্ট সহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ করেছেন। এসব বিষয়ে টেলিফোন মারফত জানার চেষ্টা করলে তারা ফোন ধরেনি এবং বন্ধ পাওয়া যায়।
বিগত আ,লীগ সরকারের আমলে এভাবেই ভূমি খেকোরা বেপরোয়া ভাবে বিভিন্ন কৌশলে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করে অনুমোদন ছাড়াই আবাসন প্রকল্পের নামে ফসলী জমি ও জলাশয় ভরাট করে প্রতারণার ফাঁদ পাতেন। এসব সম্পদ রক্ষায় বর্তমান সরকারের দলীয় নেতাকর্মীদের হাত করে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের প্রতারণা।
ইতোমধ্যে ঢাকার সাভারে রাজউক অনুমোদন ছাড়া আবাসন প্রকল্প পরিচালনা এবং ড্যাপে কৃষিজমি ও জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত জমি ভরাটের অভিযোগে ‘ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালী’ আবাসিক প্রকল্পে অভিযান চালিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। অভিযানে প্রকল্পটির দোতলা একটি সাইট অফিস গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একটি বিদ্যুৎ মিটার জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সাইনবোর্ড ও ড্রেজার পাইপ ভেঙে ফেলা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার সাভার উপজেলার বনগাঁও ইউনিয়নের বনগ্রাম এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। রাজউকের নগর-পরিকল্পনা শাখার তত্ত্বাবধানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সবুজ হাসানের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানটি পরিচালনা করেন। বিষয়টি নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।
রাজউকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ)-এ কৃষিজমি ও জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত জায়গায় বালু ভরাট করে অনুমোদন ছাড়াই আবাসন প্রকল্পের জন্য দৃশ্যমান ভূমি প্রস্তুত করার কার্যক্রম চলমান অভিযোগের ভিত্তিতে রাজউক কর্তৃক অভিযান চালানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কৃষি ও নিচু জমি বালু দিয়ে ভরাটের পাশাপাশি বিভিন্ন সাইনবোর্ড স্থাপন করে প্লট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছিল।
অভিযান চলাকালে প্রকল্পটির আশপাশে বিধিবহির্ভূতভাবে গড়ে ওঠা ‘লেক আইল্যান্ড’ ও ‘সাউথ ইস্ট হাউজিং’ নামের প্রকল্পের বিলবোর্ডও উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে রাজউক জানিয়েছে।
রাজউক আরো জানিয়েছে, বেসরকারি আবাসিক ভূমির উন্নয়ন বিধিমালা, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পে জমি বা প্লট কেনা এবং বুকিং দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে রাজউক কর্তৃপক্ষ।
অভিযানে রাজউকের উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ নবায়ন খীসা ও সাইফুল ইসলাম, সহকারী নগর-পরিকল্পনাবিদ তামজিদ বিন রাফি, শুভ সরকার ও শাহীনুর রহমান, তৌকির আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পল্লী বিদ্যুতের প্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অভিযানে অংশ নেন।
অভিযান পরিচালনার ঘটনা ধামাচাপা দিতে ফেসবুক লাইভে এসে প্রতারক চক্রের অন্যতম হোতা ডেসটিনি খ্যাত ডায়মন্ড মামুন আইন বিরোধী বক্তব্য দেন। তিনি ভিডিও লাইভে এসে গ্রাহকদের উদ্দেশ্য বলেন প্রশাসন কর্তৃক এমন অভিযান নিয়মিত ধারায় হয়ে থাকে তাতে কিছুই যায় আসেনা। গ্রাহকদের বলেন চিন্তার কোনো কারণ নেই সপ্তাহ না যেতেই সব আগের মতো হয়ে যাবে । তিনি আরো বলেন ইতোপূর্বে এমন অভিযান বহুবার হয়েছে তাতে কিছুই যায় আসেনা, বিধায় যারা শেয়ার ক্রয়কারী এবং যারা প্লট ক্রয়ে আগ্রহী সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেন আপনারা চিন্তা মুক্ত থাকুন এসব অভিযানে বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবেনা।
আবাসন প্রকল্প নিয়ে বড় প্রশ্ন?
রাজধানীর আশপাশের এলাকায় কৃষিজমি, নিচু জমি ও জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ সহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং প্রকল্পের বৈধতা যাচাই না করে প্লট কেনাবেচার অভিযোগ মাঝেমধ্যেই সামনে আসে।
এ ধরনের প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, প্রকল্পের অবস্থান, জমির শ্রেণি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, মালিকানা এবং অন্যান্য আইনগত নথি যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে বিজ্ঞাপন বা বিক্রয় প্রতিনিধির বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সরকারি নথিপত্র যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।
সাভারের ‘ঢাকা ওয়েস্টার্ন ভ্যালী’ প্রকল্পে রাজউকের এই অভিযান অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রকল্পটির জমির মালিকানা, অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং প্লট বিক্রির বৈধতা নিয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
ঢাকার আশপাশ ছাড়াও দেশের বিভাগীয় শহর গুলোতে পৌঁছে গেছে এসব ভূমি খেকোদের কালো থাবা ছড়িয়ে পড়েছে। যে কারনে হাজার হাজার বিঘা ফসলী জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে বিধায় আমাদের দেশে খাদ্য ঘাটতি মারাত্মক রুপ ধারণ করেছে। এছাড়া নদীনালা খালবিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছর বৃষ্টি মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। অচিরেই এসব অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ।