জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার চার দিন পরও নিয়ন্ত্রণে নেই নিত্যপণ্যের বাজার

Total Views : 24
Zoom In Zoom Out Read Later Print

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর চার দিন পেরিয়ে গেলেও রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। বিভিন্ন বাজারে একাধিক পণ্যের দাম বেড়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবহণ ব্যয় যতটা বেড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে তার তুলনায় বেশি হারে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কাঁচামরিচ, টমেটো, পটোল, ডিম, ডাল, আটা, ময়দা, তেল ও মাছসহ বেশ কিছু পণ্যে আগের তুলনায় বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। ক্রেতাদের একটি অংশের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার সুযোগ নিচ্ছেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়।

পরিবহণ ব্যয় যতটা, পণ্যের দাম বাড়ছে তার চেয়ে বেশি

কাওরান বাজারের এক পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বগুড়া থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আনতে ভাড়া ১৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা হয়েছে। একটি ট্রাকে ৫০ কেজির প্রায় ৩০০ বস্তা চাল পরিবহণ করা যায়। অর্থাৎ ট্রাকপ্রতি অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা খরচ হলে প্রতি বস্তায় পরিবহণ ব্যয় বাড়ে প্রায় ৭ টাকা।

তবে তাঁর দাবি, এই বাড়তি ব্যয়ের তুলনায় খুচরা বাজারে কোনো কোনো ধরনের চালে কেজিপ্রতি প্রায় ৩ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।

সবজি বাজারেও একই ধরনের পার্থক্যের কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যশোর থেকে কাওরান বাজারে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কেজি বেগুন আনতে আগে মাঝারি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২১ হাজার টাকা। এতে প্রতি কেজি বেগুনে পরিবহণ ব্যয় বাড়ে আনুমানিক ১ টাকা ২৫ পয়সা।

কিন্তু কাওরান বাজারের খুচরা পর্যায়ে বেগুনের দাম আগে কেজিপ্রতি ১০০ টাকা থাকলেও বৃহস্পতিবার তা প্রায় ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

পাঙাশেও বাড়তি দামের অভিযোগ

যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তে কুমিল্লা থেকে পাঙাশ নিয়ে আসা এক ব্যবসায়ী জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ট্রাকভাড়া ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৮ হাজার টাকা হয়েছে। এতে প্রতি কেজি মাছের পরিবহণ ব্যয় প্রায় ২ টাকা বাড়ে।

তবে তাঁর দাবি, খুচরা পর্যায়ে পাঙাশের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।

বাজার তদারকিতে সরকারি সংস্থাগুলোর তৎপরতা

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কাজ করছে। এসব কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাঠ প্রশাসনও সহযোগিতা করে থাকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি টাস্কফোর্সের এক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীতে নিয়মিত দুটি টিম দিয়ে বাজার তদারকি করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম এম আরিফ পাশা জানান, সপ্তাহের প্রতিদিনই বাজার তদারকি করা হচ্ছে এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাজার মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে তদারকি চলছে।

চার দিনে ৩৩ লাখ টাকার বেশি জরিমানা

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চার দিনে সারা দেশে ১৬৩টি টিম অভিযান পরিচালনা করেছে।

এ সময় ৩১১টি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম পাওয়ায় মোট ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে অধিদপ্তর জানিয়েছে।

রাজধানীতে অধিদপ্তরের ছয়টি টিম বাজার তদারকিতে কাজ করছে। এসব অভিযানে খাদ্য অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও যুক্ত থাকছেন বলে জানানো হয়েছে।

সমন্বিত তদারকির প্রয়োজন: ক্যাব

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকারি সংস্থাগুলো বাজার তদারকি করলেও পণ্যের দাম কমার ক্ষেত্রে এর প্রত্যাশিত প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী নানা অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, ঢাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের তুলনায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের টিমের সংখ্যা কম। ভোক্তার অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে বাজার তদারকির ব্যবস্থাপনায় আরও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন গবেষক ড. এম কে মুজেরীর মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্য, বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে পরিবহণ ব্যয়ের প্রকৃত প্রভাব এবং অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

রাজধানীর কয়েকটি পণ্যের বর্তমান দাম

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে কাঁচামরিচ কেজিপ্রতি প্রায় ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল প্রায় ১০০ টাকা।

টমেটো বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা কেজি, যা আগে ৮০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে ছিল। করলা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, পটোল ৭০ টাকা এবং ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

বড় দানার মসুর ডালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। খোলা আটা ৫০ টাকা এবং খোলা ময়দা ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে।

খোলা পাম অয়েল লিটারপ্রতি ১৭০ টাকা এবং তেলাপিয়া মাছ কেজিপ্রতি ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহণ ব্যয়ের প্রভাব বাজারে কতটা পড়েছে এবং এর বাইরে কোনো পণ্যে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া হচ্ছে কি না—এখন সেটিই ক্রেতা ও সংশ্লিষ্টদের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

See More

Latest Photos