শ্রেণিকক্ষে উপচে পড়া ভিড়, তীব্র শিক্ষকসংকট এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কারের দাবিতে ফরাসি শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন এখন রূপ নিয়েছে দেশজোড়া তীব্র বিক্ষোভে। গত দুই সপ্তাহ ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলা ‘অবরুদ্ধ’ কর্মসূচির পথ ধরে এবার এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে রাজপথে নেমেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শ্রমিক ইউনিয়নগুলোও। গত মাসে প্যারিসের একটি স্কুল থেকে সূত্রপাত হওয়া এই আন্দোলন বর্তমানে ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্সের শত শত প্রতিষ্ঠানে। আজকের এই গণবিক্ষোভকে চলমান ছাত্র আন্দোলনের ভাগ্য নির্ধারণকারী একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল ফ্রান্স: যোগ দিয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন, গ্রেপ্তার প্রায় ছয় হাজার
বেশিরভাগ জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হলেও কিছু এলাকায় পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা অনেক স্কুলের প্রবেশপথে ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেন, ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে পটকা ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ফরাসি পুলিশের কঠোর অভিযানে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংঘর্ষের এই ঘটনায় প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থী ও স্কুলকর্মী এবং ৭০০-র বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সোমবার উত্তর ফ্রান্সে সংঘর্ষের সময় একটি স্টান গ্রেনেডের আঘাতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের বাঁ হাতের মারাত্মক ক্ষতি হয়। অন্যদিকে, দক্ষিণ ফ্রান্সের মার্সেইয়ে এক স্বাস্থ্যকর্মীর দিকে মেকশিফট ফ্লেমথ্রোয়ার তাক করার অভিযোগে আরও এক ১৫ বছরের কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ।
এই ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ফ্রান্সে প্রতিবাদের সীমানা এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে এক নতুন জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোকে ‘যৌক্তিক’ বলে স্বীকার করলেও সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, কোনো ন্যায়সংগত দাবিই এমন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন জোগায় না। এর বিপরীতে, বিচারকদের প্রধান একটি ইউনিয়ন ও শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে, মাত্র ১৪ বছর বয়সী শিশু-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেও পুলিশ অতিরিক্ত ও শক্তিপ্রয়োগ করেছে।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের পেছনে অন্যতম বড় অনুঘটক হলো উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য তৈরি সরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘Parcoursup’। জটিল ও অস্পষ্ট এই সিস্টেমের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে মাসের পর মাস অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত রবিবার রাতে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকোর্নু এক চিঠিতে শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ, ভাঙাচোরা ভবন দ্রুত সংস্কার এবং উক্ত অনলাইন সিস্টেমে আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এখনো প্রশমিত হয়নি।
উল্টো শিক্ষার্থীদের এই দাবির পাশে দাঁড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ ও দেশের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো। দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী ইউনিয়ন ‘সিজিটি’ (C.G.T.) স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, আজকের এই শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের কর্মী, তাই সরকারি বাজেট কাটছাঁটের বলি তাদের হতে দেওয়া যাবে না। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার বাজেট ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে জনকল্যাণমূলক খাতের ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের আদলে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপর ঋণের বোঝা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি নিয়েছে ফরাসি প্রশাসন।