রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। তাঁদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, অর্থ সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রচার এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম ও ডিজিটাল প্রচারণার অভিযোগ, রিমান্ডে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা
রিমান্ডে নেওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া (৪৭) ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা (৪৩)।
গত রোববার দিবাগত রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সোমবার (১২ অক্টোবর) তাঁদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে যেসব অভিযোগ
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, তহবিল সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সঙ্গে জড়িত বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে তাঁরা সরকারবিরোধী প্রচার চালিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পলাতক কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁরা সহযোগীদের নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিদের শনাক্ত ও অবস্থান নির্ণয়, ডিজিটাল আলামত উদ্ধার, তাঁদের পরিচালিত অন্য ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজের তথ্য সংগ্রহ এবং অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আসামিপক্ষের বক্তব্য
শুনানিতে দেবাশীষ কুমার বড়ুয়ার পক্ষে আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মনসুর রিপন রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন। তিনি যুক্তি দেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে দেশকে অস্থিতিশীল করা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
অন্যদিকে কাজী গুলশান আরার পক্ষে আইনজীবী মশিউর রহমান বলেন, সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কারণে অন্য সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক। ফেসবুক পেজ খোলা বা কনটেন্ট তৈরি করাকে এককভাবে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না বলেও তিনি যুক্তি দেন। তিনি তাঁর মক্কেলের জামিন ও রিমান্ড বাতিলের আবেদন জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশীদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, আসামিরা সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছিলেন। দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচারের অভিযোগও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি আদালতকে জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এসব কর্মকাণ্ডে অন্য কারা জড়িত, তাঁদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখতেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
ডিবির বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ডিবির নজরদারিতে ছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছিলেন। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। সাইবার অপরাধের মাধ্যমে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার প্রমাণ পাওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে রিমান্ড আবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তাধীন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।