বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, মানি চেঞ্জারের ব্যবসা, এবং স্বর্ণ আমদানি ও পরিশোধন কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল ও গতিশীল করতে সমন্বিত নীতিমালা হালনাগাদ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা এবং পরিদর্শন প্রক্রিয়া এক ছাতার নিচে এনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একটি সমন্বিত সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণ ব্যবসায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সমন্বিত নীতিমালা জারি
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর ২০(৩) ধারা অনুযায়ী জারিকৃত এই নির্দেশনা সার্কুলারের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য বলবৎ থাকবে, যা এর আগের সংক্রান্ত অন্যান্য নির্দেশনাকে প্রতিস্থাপন করবে। নতুন এই নিয়মাবলীর আওতায় অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংক, পূর্ণাঙ্গ ও আংশিক মানি চেঞ্জার, অনুমোদিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং স্বর্ণ আকরিক ও ডোরে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ ক্যাটাগরি অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
ডলার লেনদেনের নতুন সীমা ও ফি: নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এডি ব্যাংকগুলো ব্যক্তিগত ও ভ্রমণ সুবিধার আওতায় প্রতিবার বিদেশযাত্রায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার নোট ও কয়েন ক্যাশ হিসেবে দিতে পারবে। নির্ধারিত এই সীমার অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা আন্তর্জাতিক ডেবিট, ক্রেডিট বা প্রিপেইড কার্ড অথবা অবাধ পরিবর্তনযোগ্য মুদ্রায় নেওয়ার সুবিধা রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, পূর্ণাঙ্গ মানি চেঞ্জারগুলো একজন বাংলাদেশি নাগরিকের বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বিপরীতে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার নগদ বিক্রি করতে পারবে। তবে গ্রাহকের পাসপোর্টে ডলার এনডোর্সমেন্টের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া যাবে, যা দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখা ও রসিদ প্রদান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিদেশি পর্যটকরা এনক্যাশমেন্ট সনদ দেখিয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জার থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ ডলার সমপরিমাণ অব্যবহৃত টাকা পুনর্বিনিময় করতে পারবেন।
মানি চেঞ্জারের নগদ স্থিতি ও লাইসেন্স শর্ত: নীতিমালা অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের দিনশেষে সর্বোচ্চ নগদ ডলার স্থিতি ২৫ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, ব্যাংকে থাকা ফরেইন কারেন্সি ব্যালেন্স ৫০ হাজার ডলার এবং নগদ টাকার স্থিতি সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা হতে পারবে। প্রতিটি লেনদেনের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনলাইন মনিটরিং সিস্টেমে যুক্ত করতে হবে এবং প্রতি মাসের বিস্তারিত বিবরণী পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে জমা দিতে হবে।
এক বছর মেয়াদি মানি চেঞ্জার লাইসেন্স নবায়নের জন্য মেয়াদ শেষ হওয়ার ২ মাস আগে আবেদন করতে হবে। বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় অন্তত ৫ লাখ ডলার এবং অন্যান্য এলাকায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার হওয়া বাধ্যতামূলক। একক বা অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম নিট সম্পদ ১০ লাখ টাকা এবং যৌথ মূলধনী কোম্পানির ক্ষেত্রে পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
হোটেল, গিফট শপ বা অ-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি পাসপোর্টধারীদের কাছ থেকে পণ্য বিক্রির বিপরীতে কেবল বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ করতে পারবে, তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করতে পারবে না। তারা পরিচালনার সুবিধার জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার ডলার রেখে বাকিটা পরবর্তী কার্যদিবসে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকায় রূপান্তর করবে। এদের লাইসেন্সের মেয়াদ হবে ২ বছর।
স্বর্ণ আমদানি ও পরিশোধন নীতিমালা: নীতিমালায় অনুমোদিত স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে লাইসেন্স থাকলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমদানির সুযোগ রাখা হয়নি। প্রতিটি চালানের জন্য আগে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক পূর্বানুমোদন নিতে হবে। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের ২ বছর মেয়াদি লাইসেন্সের নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ টাকা, যা মেয়াদ শেষের ৩ মাস আগে আবেদন করতে হবে।
অপরদিকে, স্বর্ণ আকরিক ও ডোরে আমদানির মাধ্যমে পরিশোধনে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট অনুমোদনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত আইসিটি অবকাঠামো, আধুনিক নিরাপদ সংরক্ষণাগার ও আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। এডি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রাথমিক অনুমতি ফি ৩০ লাখ টাকা এবং ৫ বছর মেয়াদি এই অনুমতির নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, মানি অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং ও অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক নিয়ম লঙ্ঘন করলে লাইসেন্স বাতিল বা তদারকিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পুরো অধিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে বহাল থাকবে।