বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে পরিবারতন্ত্র, পরিচালকদের মেয়াদ ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সংস্কার কার্যকর করতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যাংক খাতে সংস্কার কতটা, পরিবারতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক ফের সামনে
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে পরিবারতন্ত্র ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের উপস্থিতি, পরিচালকদের দীর্ঘ মেয়াদ এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে শিথিলতার অভিযোগ ব্যাংক খাতের সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ব্যাংক পরিচালনায় সংস্কারের আলোচনা চললেও পরিবারতন্ত্রের প্রভাব কতটা কমবে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
প্রয়াত ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ একবার বেসরকারি একটি ব্যাংকে একই পরিবারের পাঁচজন পরিচালকের থাকার ঘটনা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, তখনকার ব্যাংক কোম্পানি আইনে একই পরিবার থেকে দুজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত পরিচালকদের পদত্যাগ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তার জবাব দেয়নি। পরে আইন সংশোধন করে একই পরিবার থেকে চারজন পরিচালক থাকার সুযোগ তৈরি করা হয়।
সেই সংশোধনীর সময় পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপনের সময় বলেছিলেন, এর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকের মালিক ও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হবে। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, এসব পরিবর্তন ব্যাংকের মালিকানায় পারিবারিক প্রভাব আরও শক্তিশালী করেছিল।
পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে আইন সংশোধন করে একই ব্যাংকে একজন পরিচালকের টানা দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়। এরপর তিন বছরের বিরতি দিয়ে আবার পরিচালক হওয়ার সুযোগ রাখা হয়। এসব বিধান ব্যাংক পরিচালনায় একই পরিবারের প্রভাব ও পরিচালকদের দীর্ঘদিন পদে থাকার সুযোগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে।
ব্যাংক খাতে সংস্কারের প্রশ্ন
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করতে পরিবারতন্ত্র কমানো, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে দেখা হয়।
তবে একই পরিবারের সর্বোচ্চ কতজন ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন, সে বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একই পরিবারের তিনজনকে পরিচালক হওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা থাকলেও এর চূড়ান্ত আইনি অবস্থান ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু পরিচালকদের সংখ্যা বা মেয়াদ নির্ধারণই যথেষ্ট নয়। পরিচালকদের স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন
ঋণ পুনঃতফসিলের নীতি এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অংশ। ২০১৯ সালে বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকদের মতে, কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে বারবার ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিলে ঋণখেলাপিদের মধ্যে দায় পরিশোধে শিথিলতার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এ ধরনের উদ্বেগ ব্যাংক খাতে নীতিনির্ধারণের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে।
সংস্কারে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি
ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যকর করতে হলে আইন সংশোধনের পাশাপাশি তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক নীতি প্রয়োজন।
ব্যাংক খাতের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে পরিবারতন্ত্র ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব কমানো গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে—নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না এবং অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে কি না—তার ওপর।