'আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ......’—হত্যার আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি পোস্ট দিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। কিন্তু সেই তথ্য আর প্রকাশ করা হয়নি। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তার মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠেছে, কোন অপরাধের তথ্য সামনে আনতে যাচ্ছিলেন তিনি? সেই অনুসন্ধানের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সাংবাদিক আলিফের শেষ পোস্টে ‘অপরাধের গডফাদার’, হত্যার নেপথ্যে কী?
মাদক, চোরাচালান ও সীমান্ত এলাকার অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতেন আলিফ। ছদ্মবেশে অপরাধচক্রের কাছাকাছি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি। তার অনুসন্ধানের বিষয়গুলোর মধ্যে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে ঘিরে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি অবৈধ বালু ব্যবসা ও পাথর উত্তোলন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে আলিফ হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হত্যার কারণ নির্ধারণে তার সর্বশেষ অনুসন্ধান, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত তথ্য এবং সম্ভাব্য বিরোধের বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ
আলিফ হত্যার আগে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে পাঁচজন রোহিঙ্গা নাগরিকের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি তৈরির চেষ্টার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নথিপত্র যাচাইয়ের সময় কিছু অসংগতি পাওয়া যায়।
এর আগে একই নির্বাচন কার্যালয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকের এনআইডি তৈরির অভিযোগে কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। আলিফের মৃত্যুর আগে তার ফেসবুক পেজে রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনে ভুয়া তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে অনুসন্ধানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পাঁচজনের ভোটার নিবন্ধন বা এনআইডি তৈরির অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং এতে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
জাতীয় পরিচয়পত্রের অপব্যবহার শুধু ভোটার নিবন্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংক হিসাব খোলা, মুঠোফোনের সিম নিবন্ধন, পাসপোর্ট তৈরি ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণেও পরিচয়পত্র ব্যবহৃত হয়। ফলে বিদেশি কোনো নাগরিক ভুয়া বাংলাদেশি পরিচয়ে এনআইডি পেলে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। এ ধরনের অভিযোগের তদন্তে আবেদনকারীদের পরিচয় ও নথির সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি।
পুরোনো মাদক মামলার তথ্যও আলোচনায়
সীমান্ত অপরাধ ও পরিচয়সংক্রান্ত অভিযোগের আলোচনায় কয়েক বছর আগের একটি মাদক মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। নেত্রকোনা সদরের কে-গাতি ইউনিয়নের চুয়ারকান্দা গ্রামের ইলিয়াস কাদের বাবুলের বিরুদ্ধে অতীতে মাদকসংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
২০২২ সালের মে মাসে ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক অভিযানে বাবুল, তার রোহিঙ্গা স্ত্রী রোজিনা বেগমসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, মাদক ব্যবসার সুবিধা নিতে বাবুল ওই নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী ও আত্মীয়দের মাধ্যমে টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে ময়মনসিংহে সরবরাহ করা হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছিল।
বর্তমানে বাবুলকে ঘিরে আলোচনায় থাকা অভিযোগগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গা স্ত্রী ও তার আত্মীয়দের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা এবং স্থানীয় পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টার বিষয়ও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বর্তমান অবস্থা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং আলিফের অনুসন্ধানের সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অতীতের কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বা অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য নিজে থেকেই অপরাধ প্রমাণ করে না। একইভাবে পুরোনো মাদক মামলার সঙ্গে আলিফ হত্যার যোগসূত্রও কেবল অভিযোগ বা অনুমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না।
হত্যার নেপথ্যে কারা, তদন্তে সেই প্রশ্ন
গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উতরাইল বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক আলিফ। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন।
আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আটজনকে আসামি করে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে দুর্গাপুর পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকার পুরোনো সিনেমা হলের পাশ থেকে সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আলিফের সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে এর আগেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ অভিযোগের সত্যতা এবং আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে শুধু সরাসরি হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই নয়, ঘটনার আগে-পরে তাদের যোগাযোগ, সম্ভাব্য পরিকল্পনা, অর্থের লেনদেন এবং অন্য কারও নির্দেশ বা সহযোগিতা ছিল কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আলিফের শেষ পোস্টের পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু, তার অনুসন্ধানে সংগৃহীত নথি ও তথ্য এবং যেসব অপরাধ নিয়ে তিনি কাজ করছিলেন, সেগুলো যাচাই করলে হত্যার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
আলিফের শেষ পোস্টে যে ‘অপরাধের গডফাদারের’ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত ছিল, সেটি ঠিক কাকে বা কোন অপরাধকে ঘিরে—তা এখনো নিশ্চিত নয়। রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ, মাদক ব্যবসা কিংবা অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে তার হত্যার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা প্রমাণসাপেক্ষ। তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এসব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।