চুয়াডাঙ্গার পদ্মবিলায় বিসিআইসি সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ নীতিমালা তোয়াক্কা না করে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে ডিলারশিপ দেওয়ার দাবি বঞ্চিতদের।

Total Views : 9
Zoom In Zoom Out Read Later Print

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | (চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি): চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৭ নম্বর পদ্মবিলা ইউনিয়নে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নতুন ডিলার হিসেবে ‘মেসার্স সম্পদ এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মোঃ মাসুদ রেজা রতনের নাম ঘোষণার পর থেকেই স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বঞ্চিত আবেদনকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। ​অভিযোগ উঠেছে, সার ডিলার নিয়োগের মূল শর্তাবলী—যেমন গুদামের বাস্তব ধারণক্ষমতা, পূর্ববর্তী ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং একই স্থাপনায় অন্য ব্যবসা পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয়গুলো তোয়াক্কা না করেই অনৈতিক সুবিধা ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ডিলারশিপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। ​প্রথম সুপারিশপ্রাপ্তকে বাদ দিয়ে অন্য নাম চূড়ান্তের অভিযোগ বঞ্চিত আবেদনকারী ও 'মেসার্স জোয়ার্দার ট্রেডার্স'-এর স্বত্বাধিকারী গোলাম ইশতিয়াক শান্ত গত ১৪ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মহাপরিচালক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। তার দাবি, জেলা সার মনিটরিং কমিটির মূল্যায়নে তার প্রতিষ্ঠানকে প্রথম এবং সর্বাধিক যোগ্য হিসেবে মৌখিকভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে মেসার্স সম্পদ এন্টারপ্রাইজের নাম অনুমোদনের জন্য তালিকায় আনা হয়। ​স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকদের মতে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেন ও অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাব রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা বিসিআইসির মূল নথি, সভার কার্যবিবরণী, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অডিও-ভিডিও রেকর্ড তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। ​রাতারাতি ট্রেড লাইসেন্স ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি

পদ্মবিলা ইউনিয়নের কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, সরোজগঞ্জ ও ডিঙ্গেদহ বাজার ছাড়াও কুশোডাঙ্গা, বালিয়াকান্দি, সুবদিয়া ও খেজুরা গ্রামে সারের নিয়মিত বেচাকেনা হয়। কিন্তু ডিলারশিপ পাওয়ার পূর্বে ‘মেসার্স সম্পদ এন্টারপ্রাইজ’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের সারের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ততা ছিল না।
​অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স সম্পদ এন্টারপ্রাইজের দেখানো ট্রেড লাইসেন্সটি ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই তড়িঘড়ি করে তৈরি করা হয়েছে। সারের মতো স্পর্শকাতর পণ্যের ব্যবসার ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতা শিথিল করে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে ডিলারশিপ দেওয়া হলো, তা নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
​২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতাহীন গুদাম ও বিধিমালার লঙ্ঘন
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত কার্য এলাকায় নিজস্ব বা ভাড়ায় নেওয়া ন্যূনতম ২৫ মেট্রিক টন সার সংরক্ষণের সক্ষমতা সম্পন্ন গুদাম থাকা বাধ্যতামূলক।
​তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেসার্স সম্পদ এন্টারপ্রাইজের গুদাম হিসেবে যে স্থাপনাটি দেখানো হয়েছে, সেটি মূলত একটি একতলা আবাসিক বাড়ির ভেতরের সাধারণ রুম (পার্টিশন দেওয়া)। সেখানে সারের বস্তা রাখা, উঠানো-নামানো, বায়ু চলাচল, অগ্নিনির্বাপণ কিংবা ভার বহন ক্ষমতার মতো ন্যূনতম কারিগরি উপযোগী পরিবেশ নেই।
​আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এই একই গুদাম বা স্থাপনায় আগে থেকেই সরকারি চালের ডিলারশিপ পরিচালনা করা হচ্ছিল। একই ভবনে সরকারি চালের ব্যবসার পাশাপাশি সারের গুদামজাতকরণের অনুমোদন দেওয়া বিসিআইসি নীতিমালা ও 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড'-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা সরেজমিনে গুদাম পরিদর্শন করেছিলেন কি না এবং পরিদর্শন প্রতিবেদনে কী তথ্য জমা দিয়েছেন—তা জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি উঠেছে।
​নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনের স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি
সারসংকট ও কৃত্রিম সংকট রোধে এবং প্রান্তিক কৃষকদের সেবা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা:
​ডিলার নিয়োগের মূল ফাইল, জেলা সার মনিটরিং কমিটির সভার কার্যবিবরণী, সুপারিশ তালিকা ও গুদাম পরিদর্শন প্রতিবেদন দ্রুত জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
​ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর তারিখ, পূর্ববর্তী ব্যবসায়িক লেনদেনের রেকর্ড এবং গুদামের ধারণক্ষমতা নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে পুনরায় সরেজমিনে যাচাই করতে হবে।
​তদন্তে তথ্য জালিয়াতি, নীতিমালা লঙ্ঘন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
​সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকলে, দাপ্তরিক প্রমাণের ভিত্তিতে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে প্রশাসনকে এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে হবে।
​প্রান্তিক কৃষকদের সারের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকেই সারের দায়িত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

See More

Latest Photos