কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমিয়া শিক্ষা অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি অলাভজনক, অরাজনৈতিক ও স্বোচ্ছাসেবী সংগঠন। বাংলাদেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা যে সমস্ত ন্যায়সংগত একাডেমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তা চিহ্নিত করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং একাডেমিক সততা, উৎকর্ষ এবং জবাবদিহিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশে একটি উচ্চমানের শিক্ষার পরিবেশ তৈরির অভিপ্রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমিয়া। সংগঠনটি ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা অধিকার নিশ্চিতে কাজ করতে আগ্রহীদের সমন্বয়ে কাজ করেছে।
কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমিয়ার 'বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে একাডেমিক অধিকার লঙ্ঘন: প্রতিকারে নীতি সুপারিশ' শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
১৭ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের মওলানা আকরম খাঁ মিলনায়তনে 'বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে একাডেমিক অধিকার লঙ্ঘন: প্রতিকারে নীতি সুপারিশ' শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপর্যুক্ত সভার উদ্দেশ্য হচ্ছে ন্যায়সঙ্গত, ন্যায্য এবং জবাবদিহিমূলক একাডেমিক পরিবেশ তৈরিতে অবদান রাখা এবং শিক্ষাঙ্গনের সকল অংশীদারদের অধিকার এবং মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে সংলাপ এবং সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমীয়ার সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল মাহমুদের সঞ্চালনায় সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম, অধ্যাপক মুশতাক খান, অধ্যাপক মোঃ তারিকুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন, মীর মোঃ জসিম। ধারণাপত্র পাঠ করেন বেলাল হোসেন, আহ্বায়ক,কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমিয়া। ১২ দফা সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেন, প্লাবন তারিক, মুখপাত্র, কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমিয়া।
স্বাধীনতার উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার পর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিক্রমায় ক্ষমতার পালবদল ও বিভাজনের রাজনীতির কারণে কোন সরকারই যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষা ব্যাবস্থা সংস্কার হতে থাকে। যার ধারাবাহিকতায় জাতীয় শিক্ষা কমিশন (১৯৭২), জাতীয় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন কমিটি (১৯৭৬), জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি (১৯৭৮), মজিদ খান শিক্ষা কমিশন (১৯৮৩), মফিজউদ্দীন আহমদ শিক্ষা কমিশন (১৯৮৭), এম এ বারী শিক্ষা কমিশন (২০০১), কবির চৌধুরী শিক্ষা কমিশন (২০০৯) এবং সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষাক্রম (২০২৩) প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার পর থেকে মোট ৮ বার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও কার্যত সেখানে মৌলিক মৌলিক ত্রুটি থেকেই যায়। এমতাবস্থায় কাউন্সিল ফর দ্যা রাইটস অব একাডেমিয়া জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে একটি টেকসই ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের তাগিদে ১২ দফা সংস্কার প্রস্তাবনা উপস্থাপন করছে। নিম্নে ১২ দফা শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলোঃ
১. শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনঃ শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং বিশেষজ্ঞ নীতি নির্ধারক নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাধীন শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে, যা গবেষণা ও মূল্যয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে শিক্ষাব্যবস্থার উপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে। সেই সাথে এই কমিশন শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কাররের ক্ষেত্রে দেশের মানুষের মনস্তত্ব, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে বৈষম্যহীন, সামাজিক মর্যাদা, সাম্য ও মানবিক সমাজ ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী নীতিমালা প্রণয়ন করবে।
২. শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন: শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় চেতনা ও নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, গঠনমূলক চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়ে একটি শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করতে হবে। এর ধারাবাহিকতায় যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক তৈরির ক্ষেত্রে একবিংশ শতাব্দির জ্ঞান-দক্ষতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জাতীয় ইতিহাস ঐতিহ্য, কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী শিক্ষা, ভাষাগত দক্ষতা, পরিবেশ সচেতনতার পাঠ অন্তর্ভূক্ত থাকতে হবে।
৩. মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারঃ প্রতিটি শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও আচরণ এই তিনটি দিক মূল্যায়নের উপর জোর দিতে হবে। তাই শুধুমাত্র পরীক্ষা নির্ভর না হয়ে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক পদ্ধতির মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও সততার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে মূল্যায়ন অতি জরুরী। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াও প্রজেক্ট, এসাইনমেন্ট, দলগত কাজ ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থী মুল্যয়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৪. শিক্ষা বাজেট অগ্রাধিকার: শিক্ষা বাজেটকে জিডিপির ৬% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে হবে, যা গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির জন্য ব্যবহার করা হবে। শিক্ষাখাতে মোট বাজেটের ন্যূনতম ১০% বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং বরাদ্দকৃত বাজেটের অর্থ গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে ব্যাবহার করতে হবে।
৫. গবেষণামুখী উচ্চ শিক্ষাঃ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে প্রকৃত অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নতুন জ্ঞান উৎপাদন, গবেষণামুখী ও উদ্ভাবন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৬. নিয়োগ কমিশন প্রণয়নঃ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং মেধাবীদের প্রাধান্য নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শিক্ষা নিয়োগ কমিশন (এডুকেশন সার্ভিস কমিশন) গঠন করতে হবে, যা বিভিন্ন স্তরের নিয়োগ পরীক্ষা, মূল্যায়ন, নিয়োগ, পদায়ন ও পদন্নোতি পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়ন ও পরিচালনা করবে। এর অধীনে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য স্বতন্ত্র পে স্কেল ঘোষণা করতে হবে।
৭. মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারঃ দেশের আলিয়া ও কওমী মাদ্রাসার সংস্কারের ক্ষেত্রে দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও আলেম ওলামাদের সমন্বয়ে একটি মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার বোর্ড গঠন করতে হবে, যার কাজ হবে মাদ্রাসা শিক্ষা কারিকুলামকে ধর্ম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করে শিক্ষা কারিকুলাম সংস্কার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
৮. কারিগরি শিক্ষার মান বৃদ্ধিঃ দেশের সকল ভকেশনাল, পলিটেকটিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য করতে হবে। গণমুখি কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য এ শিক্ষা ব্যবস্থায় বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে।
৯. শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর: শেখার এবং শেখানোর অভিজ্ঞতাকে প্রাণবন্ত করার জন্য ডিজিটাল সরঞ্জাম এবং সংস্থানগুলি শিখন প্রক্রিয়াতে যুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
১০. মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থাঃ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিতের জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম একজন করে সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ দিতে হবে।
১১. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ প্রদান করতে হবে। প্রশাসনের উদ্যোগের শ্রুতি লেখকের ব্যবস্থা, যাতায়তের জন্য বিশেষায়িত পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে।
১২. বুলিং এবং র্যাগিং বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণঃ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধসংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৩' দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। মৌখিক, শারীরিক, সামাজিক, সাইবার ও যৌনসংক্রান্ত বুলিং ও র্যাগিংয়ের যথাযথ প্রক্রিয়াতে চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষা সংস্কারে আমাদের ১২ দফা প্রস্তাবনা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের জন্য একটি সুদৃঢ় এবং সমন্বিত কাঠামো তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। দেশটির শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ এবং সংস্কারের অভাব থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্রস্তাবনায় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে একটি নতুন যুগের সূচনা করা সম্ভব। শিক্ষাক্রমের আধুনিকীকরণ, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও মানোন্নয়ন, বাজেট বৃদ্ধি, এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের মতো প্রস্তাবনা দেশের শিক্ষাকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করবে। এছাড়া, শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, এবং বুলিং-রত্যাগিং প্রতিরোধের মত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করবে। এর ফলে, জাতি হিসেবে আমরা একটি দক্ষ, নৈতিক এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ নাগরিক গড়তে সক্ষম হবো। শিক্ষার মৌলিক পরিবর্তন, একটি গবেষণা ও উদ্ভাবনমুখী পরিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির দিকে ধাবিত হবে।