কে এই ইয়াসিন জঙ্গল সলিমপুরের ত্রাস

Total Views : 111
Zoom In Zoom Out Read Later Print

নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি শুরু করেন সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে। এরপর থেকেই নগরী কিংবা আশপাশের জেলার বিভিন্ন সন্ত্রাসীর কাছে নিরাপদ স্থান হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে এই দুর্গম অঞ্চলটি। র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস মারা যাওয়ার পর এলাকা ভাগ করে নেয় তার সহযোগীরা।

রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মশিউর, গফুর ও ইয়াসিন সেখানে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মশিউর ও গফুর নীরব হয়ে যায়। এ সুযোগে ভোল পালটে একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন এক সময় জুট মিলে চাকরি করা ইয়াসিন। আধিপত্য ধরে রাখতে গড়ে তোলেন নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী।

আর সেই বাহিনী দিয়ে প্রশাসনের লোকজনের ওপর একের পর এক হামলা। এমনকি এই বাহিনীর হামলায় আহত হয় সাংবাদিকও। সবশেষ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রেফতার করতে গিয়ে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা প্রাণ হারান। এরপরও এক ভিডিও বার্তায় হুঁশিয়ারি দিয়ে আলোচনায় আসেন এই ইয়াসিন। তবে এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সাধারণ মানুষ থেকে যেভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী : ২০০৩ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন মোহাম্মদ ইয়াসিন। সঙ্গে নিয়ে আসেন ছোট ভাই ফারুককে। নিজে যোগ দেন একটি জুট মিলে। টাকার অভাবে বাসা ভাড়া নেন জঙ্গল সলিমপুরে। আর সেখানে গিয়েই অপরাধ জগতের গডফাদার হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সে সময় জঙ্গল সলিমপুরের ত্রাস আলী আক্কাসের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন তিনি। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

বড় ধরনের সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলতে মাঠে নামেন। প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে নগরী ও আশপাশের জেলার সন্ত্রাসীদের মধ্যে যারাই পুলিশের ভয়ে থাকত তাদেরই আশ্রয় দিতেন ইয়াসিন। এরপর থেকে নিজেও পাহাড় কেটে শুরু করেন প্লট বাণিজ্য। আর সেই বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে গড়ে তোলেন নিজের বিশেষ বাহিনী। এভাবে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসীদের দুর্ভেদ্য আখড়ায় পরিণত হয় জঙ্গল সলিমপুর।

জানা গেছে, সন্ত্রাসী আলী আক্কাস র‌্যাবের ক্রসফায়ারে মারা যাওয়ার পর সেখানে প্রভাব বিস্তার শুরু করে কাজী মশিউর রহমান, ইয়াছিন, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেকসহ সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা। কিন্তু একপর্যায়ে তারা পৃথক সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরির চেষ্টা করলে সংঘর্ষ, খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা বেড়ে যায়। এ কারণে ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে অভিযান চালিয়ে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করে যৌথ বাহিনী। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হতে থাকে।

কিন্তু রহস্যজনক কারণে পরে সেখানে সব অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সন্ত্রাসীরা। যাদের অনেকে এক সময় বিএনপির অনুসারী হিসাবে পরিচিতি পেলেও পরে আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও বেপরোয়া ওঠে। এরপর তারা সেখানে ছিন্নমূল বস্তি ও আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি নামে দুটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করে।

শুরু থেকে আলীনগর সমবায় সমিতির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন ইয়াসিন। এ সমিতির মাধ্যমেই সরকারি জমিকে বেসরকারি প্লট বানিয়ে বিক্রির মহোৎসব শুরু হয়। গত ২০ বছরে সেখানে কয়েক হাজার প্লট বিক্রি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে যায় এই ইয়াসিন।

সূত্র জানায়, সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে ৫টি মৌজায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি রয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোতে এই স্থানটি সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার লিংক রোড দিয়ে। কম টাকায় ‘জমি কিনে’ সেখানে বসতি স্থাপন করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ। দেশের প্রায় সব জেলার মানুষই সেখানে রয়েছে। যাদের অধিকাংশই নিম্নবিত্তের মানুষ।

‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’সহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে এলাকাটির ভেতরে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, কেজি স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কবরস্থান, শ্মশান, কেয়াং, মন্দির, গির্জা ও বাজারসহ সবই গড়ে তোলা হয়েছে। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী ওই এলাকায় প্রায় ১৯ হাজার মানুষ বসবাস করে। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছে, সেখানে ১০টি সমাজের প্রায় ৩০ হাজারের বেশি পরিবার রয়েছে। সেসব পরিবারের লক্ষাধিক সদস্য সেখানে বসবাস করছে।

যেভাবে ভয়ংকর হয়ে ওঠে ইয়াসিন : ২০২২ সালে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে অভিযান চালাতে গেলে হামলা করে ইয়াসিন বাহিনী। কিন্তু এই বাহিনীর সদস্যরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে জেলা প্রশাসনকে অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য করে। ওই বছরই জঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গুলিবিনিময় হয়। একই বছরে অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে বাধা দেওয়া হয় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। ২০২৩ সালে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ি এলাকা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হন।

এমনকি জুলাই আন্দোলনে পটপরিবর্তনের পর পাহাড়ি এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বজায় রাখতে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ ১৯ জানুয়ারি বিকালে র‌্যাব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রেফতার করতে গেলে ইয়াসিন বাহিনীর লোকজন তাদের ওপর হামলা চালায়। ওই হামলায় র‌্যাবের চার সদস্য গুরুতর আহত হয়। পরে যৌথ বাহিনী গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে আসে। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পর র‌্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া মারা যান। ঘটনার পর থেকে এখনো র‌্যাবের তিনজন সদস্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এদিকে জঙ্গল সলিমপুরে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় র‌্যাবের কর্মকর্তা নিহত ও আহতের ঘটনায় ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ২০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের হয়। এ মামলায় এখন পর্যন্ত চারজন গ্রেফতার হলেও প্রধান আসামি আলোচিত ইয়াসিন গ্রেফতার হননি।

গত ২১ জানুয়ারি এক ভিডিও বার্তায় ইয়াসিন বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে যদি অহেতুক কোনো ঝামেলা সৃষ্টি হয় বা অপরাধের ফাঁদে ফেলে কেউ গোলযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে বড় ধরনের জনবিস্ফোরণ ঘটবে।’ তিনি বলেন, এখানে যত সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সবই হচ্ছে রোকন মেম্বারের লোকজনের মাধ্যমে। ডিসি পার্ক থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় তার লোকরা চাঁদাবাজি করছে। চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে সে আমাদের এই এলাকা দখল করতে চায়।

তার কাছে সব অস্ত্রের ভান্ডার রয়েছে। আমি কথা দিচ্ছি-এই রোকন মেম্বারকে গ্রেফতার করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে টাকা তুলে এখানে র‌্যাবকে এনেছে। ইয়াসিন বলেন, আজ আবারও জোরালোভাবে বলছি-এলাকায় যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তাহলে বড় ধরনের জনবিস্ফোরণ ঘটবে। এই জনবিস্ফোরণের দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে।

See More

Latest Photos