ঈদ উৎসবে সড়কের শোকগাথা যেন না বাড়ে

Total Views : 4
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ঈদ বাংলাদেশের মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সামাজিক ও পারিবারিক উৎসবগুলোর একটি। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর দেশের বড় শহরগুলো থেকে লাখো মানুষ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। আনন্দের এ যাত্রা অনেক সময় হয়ে ওঠে দুর্ভোগ, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তায় ভরা। তাই নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা এখন শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়, একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ।

ঈদ সামনে এলেই দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রী চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যানজট, দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিট সংকট এবং চাঁদাবাজির মতো নানা সমস্যা। ফলে যে যাত্রা হওয়ার কথা আনন্দের, তা অনেক সময় উদ্বেগ আর দুর্ভোগে পরিণত হয়। প্রতি বছরই এসব সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে, যদিও সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নানা ধরনের প্রস্তুতির কথা জানায়।

বিশেষ করে সড়কপথে দুর্ঘটনার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। সড়কপথ বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত যাতায়াত মাধ্যম। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, ঈদের আগে ও পরে কয়েকদিন সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা সাধারণ সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়না, ক্লান্ত ড্রাইভার, অতিরিক্ত যাত্রী এবং অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য চালকের উপস্থিতি এ ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অপরিকল্পিত মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা।

গত বছরের ঈদুল ফিতরকে ঘিরে কয়েকশ সড়ক দুর্ঘটনায় তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। একইভাবে ঈদুল আজহার সময়ও দুই শতাধিক দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু ও আহত হয়েছে। এ পরিসংখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঈদযাত্রার আনন্দের সঙ্গে লুকিয়ে থাকে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দাবি ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মহাসড়কে বিশেষ নজরদারি, হাইওয়ে পুলিশের টহল বৃদ্ধি, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং পরিবহণ শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে সমন্বিত পরিকল্পনার কথাও বলা হচ্ছে। তবুও বাস্তবতা হলো, পরিকল্পনা যতই ভালো হোক, তার কার্যকর বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ।

সড়কে দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণা ও নাগরিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। শহর থেকে গ্রামে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ বারবার সামনে আসে। প্রথমত, অতিরিক্ত গতি। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণহীন বা লাইসেন্সবিহীন চালক। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার না করা।

এ ছাড়া মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত যাত্রী বহনও বড় সমস্যা। অনেক সময় দুজনের বদলে তিনজন বা তার বেশি আরোহী নিয়ে চলাচল করা হয়, যা ভারসাম্য নষ্ট করে। একই সঙ্গে ট্রাফিক আইন অমান্য করা, বিপরীতমুখী লেনে চলা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন করা কিংবা ফুটপাত ব্যবহার করার মতো আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ঈদযাত্রার সময় মোটরসাইকেলের ব্যবহার আরও বেড়ে যায়। অনেকে যানজট এড়াতে বা বাসের টিকিট না পেয়ে মোটরসাইকেলেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু মহাসড়কে দীর্ঘ দূরত্বে মোটরসাইকেল চালানো অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ক্লান্তি, রাতের অন্ধকার বা ঘন কুয়াশা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।

তবে সমস্যা শুধু মোটরসাইকেলেই সীমাবদ্ধ নয়। সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও বড় একটি কারণ। নিরাপদ ঈদযাত্রার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় সমস্যা হলো সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে সড়ক প্রশস্তকরণ বা ব্যবস্থাপনা সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি। অনেক মহাসড়কে এখনো বাজার, অবৈধ স্ট্যান্ড, ধীরগতির যানবাহন এবং অপরিকল্পিত সংযোগ সড়কের কারণে যানজট তৈরি হয়। আবার কোথাও কোথাও রাস্তার গর্ত, অসমতল পিচ বা পর্যাপ্ত সাইনবোর্ডের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

অন্যদিকে রেলপথে ঈদযাত্রা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও এখানে দেখা যায় টিকিট সংকট ও কালোবাজারির সমস্যা। অনলাইনে টিকিট বিক্রি চালু হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি এলেও এখনো অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন যে তারা কাঙ্ক্ষিত সময়ে টিকিট পান না। এর ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পরিবহণ বেছে নেন।

নৌপথে যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্যও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য লঞ্চ ও ফেরি যাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব এবং ঘন কুয়াশার বা আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি এ খাতেও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে শুধু প্রশাসনিক প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। মহাসড়কে নিয়মিত টহল, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর নজরদারি অপরিহার্য। একই সঙ্গে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়িতে না ওঠা, অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচলকারী পরিবহণ বর্জন করা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা-এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একইভাবে চালকদের জন্যও প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, বিশ্রাম এবং নিয়ম মেনে গাড়ি চালানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

প্রযুক্তির ব্যবহারও সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্পিড ক্যামেরা, ডিজিটাল ট্রাফিক মনিটরিং, সিসিটিভি নজরদারি এবং অনলাইন জরিমানার ব্যবস্থা চালু হলে নিয়মভঙ্গ কমতে পারে। অনেক উন্নত দেশে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা এবং রিয়েল-টাইম ট্রাফিক আপডেট যাত্রীদের যাত্রাকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু মহাসড়কে ক্যামেরা ও ডিজিটাল মনিটরিং চালু হয়েছে, তবে তা আরও বিস্তৃত করা দরকার।

এছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ঈদযাত্রার আগে ও চলাকালে সড়ক নিরাপত্তা, যাত্রী অধিকার এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে সংবাদমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তথ্য আদান-প্রদানের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। শুধু উৎসবের সময় সাময়িক উদ্যোগ নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দক্ষ চালক তৈরি এবং কঠোর আইনপ্রয়োগ-এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, ঈদযাত্রা আনন্দের যাত্রা হওয়া উচিত, আতঙ্কের নয়। ঘরে ফেরার এই পথ যেন দুর্ঘটনা, দুর্ভোগ বা অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢাকা না পড়ে, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত লক্ষ্য। প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ, পরিবহণ খাতের দায়বদ্ধতা এবং নাগরিকদের সচেতন আচরণ একত্রে কাজ করলে ঈদের এ মহাযাত্রা হতে পারে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং সত্যিকারের আনন্দময়।

নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা তাই শুধু একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়; এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।

এস এম আজাদ হোসেন : সোস্যাল অ্যাক্টিভিস্ট; ভাইস-চেয়ারম্যান, নিরাপদ সড়ক চাই

Advertisement
Advertisement
Advertisement

See More

Latest Photos