সবাইকে ঈদ মোবারক,পবিত্র ঈদুল আজহা

Total Views : 9
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ত্যাগের মহিমা, ঐশী অনুপ্রেরণা ও আনন্দের বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। আরবী ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ, খুশি, উৎফুল্লতা ইত্যাদি। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদ নিছকই আনন্দ, খুশি বা উৎফুল্লতা নয়। এর সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক দিকও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ঈদুল আজহা মহান আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ ও আত্মত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল। পশু কোরবানির মাধ্যমে পরম করুণাময় আল্লাহর নির্দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও তার সন্তুষ্টি অর্জনই ঈদুল আজহার লক্ষ্য। কোরবানি ঈদুল আজহার প্রধান আমল বা কর্তব্য। এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হলো, নিজের মধ্যে থাকা পশুবৃত্তি ও স্বভাবকে কোরবানির মাধ্যমে বিনাশ করা। মহানবী (সা.) এই ঈদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেছেন, এটি তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নাত। বলাবাহুল্য, হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহপাকের প্রতি গভীর আনুগত্য ও তাঁর রাহে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের যে নজির স্থাপন করেন, ঈদুল আজহা তারই স্মারক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নির্দেশে এবং সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তার নজির মানব ইতিহাসে বিরল। আল্লাহপাকের নির্দেশে হযরত ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। সেই থেকে আল্লাহতায়ালার নির্দেশে পশু কোরবানির বিধান চালু হয়। সেই সঙ্গে সারাবিশ্ব থেকে পবিত্র নগরী মক্কা-মদিনায় হজের উদ্দেশ্যে সমবেত লাখ লাখ মুসলমানের লাব্বায়েক ধ্বনিতে মুখরিত হয় আকাশ বাতাস। এ বছরের হজের আনুষ্ঠানিকতা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। ঈদুল আজহার মর্মবাণী হলো, এই তাকওয়া। তাকওয়ার অর্থ হলো, মুমিনের সেই সংকল্প যাতে প্রয়োজন বোধে সে তার সব কিছু এমনকি প্রাণও আল্লাহপাকের নামে কোরবানি করতে প্রস্তুত। আসলে যে কোরবানিতে তাকওয়া নেই, আল্লাহপাকের দৃষ্টিতে তার কোনো মূল্য নেই। গোশত খাওয়া, সামাজিকতা রক্ষা করা কিংবা অর্থবিত্তের গরিমা প্রকাশ করা কোরবানি নয়। কোরবানির নিয়ত ও লক্ষ্য যদি ঠিক না হয়, তবে সে কোরবানির কোনো ফায়দা নেই। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, আমাদের দেশে কোরবানির এই দিকটি অনেকেই খেয়াল রাখেন না। অনেকেই কোরবানির মর্মবাণী অনুধাবন না করে নানা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে কোরবানি করেন। তাদের কোরবানি তাদের কোনো কাজে আসে না। কোরবানির ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যের পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক, মানবিক নানা কল্যাণকর দিকও রয়েছে। ধনী-দরিদ্র সবাই যেন ঈদের আনন্দ সমভাবে উপভোগ করতে পারে, সে জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কোরবানির গোশতের অংশ আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্রের মধ্যে বিতরণ আবশ্যক, যাতে তারাও ঈদের আনন্দ সমভাবে ভোগ করতে পারে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, দেশে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস ওঠা কোটি কোটি মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাদের জীবনে ঈদের আনন্দ বলে কিছু নেই। সামর্থ্য অনুসারে, তাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া কর্তব্য। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে ঈদের আনন্দ-সওগাত পৌঁছে দেয়া প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের নৈতিক-সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতায় এবার ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। অনেক বছর বাদে দেশের ক্ষমতায় রয়েছে একটি নির্বাচিত সরকার। গত ঈদুল ফিতরও এই সরকারের সময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। সত্যের খাতিরে স্বীকার করতে হবে, ঈদুল ফিতরে সড়ক, নৌ ও রেল পরিবহনের ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা আকাক্সক্ষা অনুযায়ী নিশ্চিত করা যায়নি। দীর্ঘ ছুটি সত্ত্বেও ঈদযাত্রীদের যাতায়াতে অশেষ বিড়ম্বনা ও দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে আগের ঈদের অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্মরণে রেখেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না হওয়া, বৃষ্টিবাদল হওয়া, যানজটের আশঙ্কা ইত্যাদি সত্ত্বেও যাতায়াত গতপরশু পর্যন্ত বিড়ম্বনা ও ভোগান্তিমুক্তভাবেই হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ঈদ ও ঈদযাত্রার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ওই সরকারের সময় ঈদে রাস্তাঘাট যানজটমুক্ত, নিরাপদ ছিল, আইনশৃংখলা ছিল সন্তোষজনক। ওই সরকারের সময় দেশের পরিস্থিতি যেকোনো বিবেচনায় নাজুক ছিল। তখন যদি ঈদযাত্রা নিরাপদ, মসৃণ ও ঝামেলামুক্ত করা সম্ভব হয়, তবে এখন সম্ভব হবে না কেন? দেখা গেছে, যখন সড়ক, নৌ ও রেল পথে অধিক সংখ্যক গণপরিবহন চলাচল করে তখন দুর্ঘটনার সংখ্যাও বেশি হয়। এবারের ঈদুল আজহায়ও সে আলামত দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অধিক যাত্রী বহন, ট্রাফিক আইন না মানা, বেপরোয়া যানবাহন চালনা ইত্যাদি প্রতিরোধ করতে হবে। এতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা কমবে। দ্বিতীয়ত, ছুটি যেহেতু দীর্ঘ, আইন-শৃংখলার অবনতির আশঙ্কাও তাই বেশি থাকবে। শহরের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রেই প্রহরাহীন, অনিরাপদ থাকবে। সেক্ষেত্রে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও প্রহরা বাড়াতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ঈদের সময় অপরাধীচক্রগুলো বিশেষ করে অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি, ছিনতাইকারী, রাহাজান, জাল টাকার কারবারী রাজধানী থেকে শুরু করে সারাদেশে বেপরোয়া হয়ে উঠে। ইতোমধ্যে এদের অপকর্ম ও অপরাধের শিকার হয়েছে অনেকে। এই অপরাধীচক্রগুলোকে প্রতিহত করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশজুড়ে বিভিন্ন চাঁদাবাজচক্রও অত্যন্ত সক্রিয় ও তৎপর হয়ে উঠেছে। ঈদে পশুবাহী যানবাহনে চাঁদাবাজি হচ্ছে অবাধে। সাধারণত পেশাদার সন্ত্রাসী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, পুলিশ, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী নামধারী ব্যক্তিবর্গ চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদাবাজরা এখন রীতিমত পাগল হয়ে গেছে। সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ কোন দলের হতে পারে না। তাদের পরিচয় কেবল সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ হিসেবে। অথচ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়া গ্রহণ করে এবং তাদের অপকর্ম ও অপরাধ চালাতে অধিক নিরাপদ বোধ করে অথবা নিরাপত্তা লাভ করে। ক্ষমতাসীন বিএনপির অনেক নেতা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএনপিকে চাঁদাবাজের দল হিসেবে ট্যাগ দেয়ার রাজনৈতিক অপকর্ম সক্রিয় আছে। এমতাবস্থায়, চাঁদাবাজদের ব্যাপারে দল ও সরকারকে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইতোপূর্বে দলীয় চাঁদাবাজদের ব্যাপারে বহিষ্কারসহ কঠোর পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও তেমন ফল পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে যথোচিত কঠোরতা দেখাতে হবে। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, পাড়া-মহল্লা, ব্যবসাকেন্দ্র, হাসপাতাল, চিকিৎসালয়Ñ সর্বত্র ‘অভয়ারণ্য’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের সর্বমুখী নিরাপত্তা বিধানে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে, এটাই একান্ত প্রত্যাশা। পরিশেষে দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষের ঈদুল আজহা উদযাপন সফল ও সার্থক হোক, এই কামনা করি। সবাইকে ঈদ মোবারক।

See More

Latest Photos