৭.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি ও জ্বালানি সংকট সমাধানের তাগিদ; বিনিয়োগে আস্থার অভাব নিয়ে উদ্বেগ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ: সিপিডির নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট
টানা চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা অর্থনীতিকে নতুন অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে বেশ ‘উচ্চাভিলাষী’ বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ ও সুপারিশ তুলে ধরেন।
মুদ্রানীতি ও খাদ্য সরবরাহের ওপর জোর
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অত্যন্ত সতর্ক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরও কিছুদিন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। একইসঙ্গে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা এবং উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকটের সমাধান না করতে পারলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমানো কঠিন হবে।”
জিডিপি ও বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল বাজেটের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি। এই বিশাল ব্যয়ের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের গতিধারা বিবেচনায় নিলে আগামী বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ ধরা হয়েছে, অথচ চলতি অর্থবছরের সরকারি হিসাবেই তা ৪ শতাংশের আশপাশে। এই বড় পার্থক্য কীভাবে পূরণ হবে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা প্রয়োজন।”
ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের আস্থার সংকট
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৯.৪ শতাংশ ধরা হলেও চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত তা মাত্র ৪.৭৫ শতাংশে আটকে আছে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ এখনো নিম্নমুখী। এর মূল কারণ হচ্ছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার অভাব। এই আস্থার সংকট দূর করতে না পারলে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব নয়।”
দুর্বল অর্থনীতির সূচক ও উত্তরণের পথ
সিপিডি জানিয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকই বর্তমানে চাপের মুখে। যদিও রিজার্ভ ও রেমিটেন্স প্রবাহে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ রয়েছে, তবুও রাজস্ব আহরণ এবং রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মোকাবিলায় রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
মূল্যস্ফীতির ইতিহাস ও বর্তমান সংকট
বিবিএসের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। কোভিড মহামারি এবং পরবর্তীতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি—সব মিলিয়েই অর্থনীতি এখন এক নাজুক সন্ধিক্ষণে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন বাজেটে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, বিনিয়োগ খরা এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিরসনে কার্যকর রোডম্যাপের অভাব রয়েছে।