রাজনীতির মায়াজাল ও সাধারণের ভ্রান্তিবিলাস: এক ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার খেরোখাতা

Total Views : 23
Zoom In Zoom Out Read Later Print

‘বুঝ কী রাজনীতির ভাও? তুমি কেন কার তরি বাও?’ ১৭শ শতকের মহাকবি আলাওল তাঁর কালজয়ী মহাকাব্য ‘পদ্মাবতী’-তে প্রতীকী অর্থে যে গূঢ় সত্যের অবতারণা করেছিলেন, সেই জিজ্ঞাসা আজ একবিংশ শতাব্দীর ২০২৬ সালের এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক আবহে দাঁড়িয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, আরও বেশি তীক্ষ্ণ।

ক্ষমতার পাশাখেলায় যুগে যুগে কেবল বোড়ে আর ছক বদলায়, কিন্তু চালের মহড়ায় রক্ত ঝরে চিরকাল একদল ভাগ্যাহত, অবহেলিত সাধারণ মানুষের। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর বাংলার মসনদ দখলের যে অন্ধ মোহ, অন্যের ক্রীড়নক হওয়ার যে আত্মঘাতী দাসত্ব আমরা দেখেছিলাম; আজকের তথাকথিত আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক রাজনীতিতেও সেই একই নির্মম মারপ্যাঁচ সমানভাবে দেদীপ্যমান। ইতিহাস এখানে কোনো প্রগতি নয়, বরং চক্রাকার এক ট্র্যাজেডি। ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে সাধারণ মানুষের শতাব্দী-দীর্ঘ ‘ভ্রান্তিবিলাস’ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রথম বলি হওয়ার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আমাদের এক গভীর আত্মানুসন্ধানের মুখোমুখি দাঁড় করায়।


ক্ষমতার আড়ালে ক্ষমতার চাল: অতীত বনাম একবিংশ শতাব্দীঃ

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন মুঘল, পাঠান, বারো ভূঁইয়া আর আরাকান রাজসভার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছিল, তখন বাংলার আমজনতা ছিল সম্পূর্ণ প্রান্তিক। সুবাদার ইসলাম খান যখন ঢাকা আক্রমণ করেন, তখন এ দেশের অনেক স্থানীয় সামন্তপ্রভু নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে ও সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে বহিরাগত শক্তির দাসত্ব বরণ করেছিলেন। মহাকবি আলাওলের জীবনকালেই ক্ষমতার এই নির্মম পালাবদল ও যুদ্ধ-বিগ্রহের রূপ প্রত্যক্ষ করা গেছে, যেখানে রাজন্যবর্গ নিজেদের ভাইদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে ধরে ‘অন্যের তরি’ বেয়েছিলেন।

চারশত বছর পর, ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণে কি খুব বেশি গুণগত পরিবর্তন এসেছে? আজকেও আমরা দেখি, ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের বৈশ্বিক দাবার ছকে এ দেশের রাজনৈতিক কুশীলবেরা নিজেদের ক্ষমতা লাভ বা রক্ষার মোহান্ধতায় বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক হতে দ্বিধা করছেন না। জাতীয় স্বার্থকে বলি দিয়ে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের এই যে অন্ধ মোহ, তা আসলে মধ্যযুগের সেই সামন্ততান্ত্রিক দাসত্বেরই এক আধুনিক, পরিমার্জিত সংস্করণ।


উপমহাদেশের ভ্রান্তির ঐতিহাসিক পরম্পরাঃ

ভারত উপমহাদেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে রাজনীতি এক অদ্ভুত আফিমের মতো কাজ করে আসছে। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তিনটি প্রধান ভ্রান্তি লক্ষ করা যায়ঃ

আবেগের অন্ধ সামন্তবাদ: এ দেশের মানুষ সহজাতভাবেই ভীষণ আবেগপ্রবণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আমরা প্রাতিষ্ঠানিক নীতির চেয়ে ব্যক্তির ক্যারিশমাকে অন্ধভাবে পুজো করতে ভালোবাসি। এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শাসকেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুরক্ষিত কক্ষে বসে ক্ষমতার ছক আঁকেন, আর সাধারণ মানুষ তীব্র আবেগে উদ্বেলিত হয়ে রাজপথে নিজেদের জীবন বিসর্জন দেয়।

বিভাজনের সুনিপুণ ফাঁদ: ঔপনিবেশিক ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ (Divide and Rule) নীতি আজও এ দেশের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। ধর্ম, অঞ্চল, ভাষা কিংবা কৃত্রিম মতাদর্শিক দেয়াল তুলে দিয়ে জনগণকে সর্বদা খণ্ডিত করে রাখা হয়। সাধারণ মানুষ যখন পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি আর ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় লিপ্ত থাকে, শাসকেরা তখন পর্দার আড়াল থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়।

প্রতিহিংসার চিরন্তন বলী: ১৯৪৭-এর দেশভাগ, কিংবা তৎপরবর্তী রাজনৈতিক গণ-অভ্যুত্থানগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি বাঁকে সবচেয়ে বড় খেসারত দিয়েছে সাধারণ নাগরিক। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে খাক হয়েছে দিনমজুরের ঘর, স্তব্ধ হয়েছে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, আর ঝরে গেছে নিষ্পাপ তরুণের প্রাণ। অথচ, ক্ষমতার চূড়ায় বসা মানুষগুলো সব সময়ই থেকে গেছে অধরা ও অক্ষত।


মুক্তির পথ: ঐতিহাসিক মোহাচ্ছন্নতা থেকে উত্তরণের উপায়ঃ

সোমালিয়ার মোগাদিসুতে অবস্থিত দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে, তরুণ প্রজন্মের অভিভাবক এবং এই সমাজের একজন চিন্তক হিসেবে আমি মনে করি, এই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা আত্মঘাতী খেলা থেকে মুক্তির এখনই সময়। সাধারণ জনগণকে এই মোহাচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হয়ে রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ক হতে হবে:


মুক্তির চার স্তম্ভ, করণীয় ও নাগরিক পদক্ষেপঃ

ব্যক্তিপূজার অবসান: কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা অভ্রান্ত নন। অন্ধ আনুগত্য মানুষের বিবেক ও চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দেয়। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যায়কে অন্যায় এবং অধিকার হরণকে নিপীড়ন বলার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস অর্জন করতে হবে।


দাবার বোড়ে হওয়া বন্ধ করা: সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে, রাজনীতির বিশাল ক্যানভাসে তারা কোনো নেতার বাহুবল বা কেবলই একটি ‘ভোটের সংখ্যা’ নন। নেতাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের মিছিলে গিয়ে বা তাদের প্রতিহিংসার হাতিয়ার হয়ে নিজের অমূল্য জীবন ও পরিবারকে ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না।


অধিকারের যৌক্তিক প্রশ্ন: রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা। কিন্তু আমাদের রাজনীতিকে আবর্তিত করা হয় সস্তা স্লোগান আর অতীতমুখী বিতর্কে। নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রশ্ন করতে শিখতে হবে—কেন রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে?


বৃহত্তর নাগরিক ঐক্য: রাজনৈতিক দলগুলো টিকে থাকে জনগণের বিভাজনের ওপর ভর করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং অনিরাপত্তার কোনো দলীয় রঙ নেই। তাই সংকীর্ণ দেয়াল ভেঙে নিজেদের নাগরিক অধিকার আদায়ের প্রশ্নে সাধারণ মানুষকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।


নতুন আশার দিগন্ত: দূরদর্শী নেতৃত্বের আবশ্যকতাঃ

তবে এই অন্ধকার ও চক্রাকার ট্র্যাজেডির মাঝেও সমকালীন রাজনীতিতে এক নতুন আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বস্তি ও আশার কথা হলো, বিএনপি'র সরকার ও রাজনৈতিক দর্শন কখনওই অতীতকে চর্চাক্ষেত্র বানিয়ে শত্রুতা বজায় রেখে পশ্চাৎমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তারা অতীতের প্রতিহিংসামূলক বৃত্ত ভেঙে একটি প্রগতিশীল, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চায়।

এই নতুন ধারার রাজনীতির অগ্রনায়ক হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যেই আপাময় জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সাড়াজাগাতে, উদ্দীপনা সৃষ্টিতে ও নতুন বিশ্বাসের সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর দূরদর্শী রূপকল্প এবং সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অনবদ্য প্রতিশ্রুতি দেশের মানুষকে এই গভীর ভরসা দিচ্ছে যে, তিনি দেশকে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে তাদের দীর্ঘদিনের কাংখিত ও অধিকার-সুনিশ্চিত সরোবরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন।


উপসংহার: একটি আত্মজিজ্ঞাসাঃ

মহাকবি আলাওলের সেই বাণী মনে রেখে আজ প্রতিটি নাগরিকের নিজের ভেতরের বিবেককে প্রশ্ন করা উচিত—কার স্বার্থে কার তরি বাইছেন? চারশত বছর আগের সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা আর আজকের আধুনিক ছদ্মবেশী রাজনীতির চরিত্র মূলত একই—যদি না জনগণ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। সাধারণ মানুষের বুকের তাজা রক্ত আর আত্মত্যাগ কেবলই স্বৈরশাসক বা সুবিধাবাদীদের মসনদ অলঙ্কৃত করার জন্য হতে পারে না। এই রাজনীতির মায়াজাল ও ভ্রান্তিবিলাস ছিন্ন করে আমাদের নিজস্ব আত্মপরিচয় ও অধিকারের রাজনীতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাষ্ট্র হবে প্রকৃত অর্থেই নাগরিকের, কোনো একক ক্ষমতার পুত্তলিকাদের নয়।


লেখকঃ - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

See More

Latest Photos