উপদেষ্টার দিল্লি সফর ও প্রটোকল ট্র্যাজেডি: রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নে লাল বনাম সবুজ পাসপোর্ট

Total Views : 65
Zoom In Zoom Out Read Later Print

প্রফেসার ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক। সম্প্রতি দিল্লি বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন উপদেষ্টা ডাঃ জাহেদ উর রহমানের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি দেশীয় রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং গভীর উদ্বেগের। একজন রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারক যখন সরকারি সফরে গিয়ে বন্ধুভাবাপন্ন দাবি করা একটি দেশের বিমানবন্দরে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তখন প্রশ্ন ওঠে—অপমানটা কি কোনো ব্যক্তির, নাকি একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের? এই ঘটনার পর দেশের সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে নানান সমীকরণ এবং প্রশ্নের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।

পাসপোর্ট বিতর্ক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাঃ

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, লাল পাসপোর্ট (কূটনৈতিক পাসপোর্ট) ব্যবহার না করে সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে বিদেশে যাওয়ার কারণে তৎকালীন সরকারের প্রতিমন্ত্রী মরহুম সৈয়দ আবুল হোসেনকে তার পদ হারাতে হয়েছিল। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় পদে থেকে পাসপোর্টের ব্যবহারে অসচেতনতা কতটা সংবেদনশীল বিষয়, তা আমাদের অতীত ইতিহাসই বলে দেয়।

আর আজ দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে একজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন উপদেষ্টা বিদেশ সফরে গেলেন সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে। আইনগতভাবে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি এটি করতে পারেন কিনা, তা হয়তো আইনজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি—আইনে যা-ই থাকুক না কেন, কিংবা আইনি সুবিধা থাকলেও, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বকারীদের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করা দেশের ‘ডিগনিটি’ বা মর্যাদার জন্য অপরিহার্য। কারণ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন সরকারি প্রতিনিধির পাসপোর্টই তার এবং তার দেশের প্রথম পরিচয়।


কূটনৈতিক পাসপোর্ট: থাকার কথা, না থাকলে কেন নেই?

বাংলাদেশ সরকারের ‘পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩’ এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকল রুলস অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় কাজে বিদেশ ভ্রমণের জন্য কূটনৈতিক পাসপোর্ট (Diplomatic Passport) বা ‘লাল পাসপোর্ট’ দেওয়া বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক আইন (ভিয়েনা কনвенশন) অনুযায়ী, এই পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা বিদেশে বিশেষ প্রটোকল, বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার, দ্রুত ইমিগ্রেশন পারাপার এবং এক ধরণের আইনি অনাক্রম্যতা (Immunity) পান।

যখন একজন উপদেষ্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সাধারণ পাসপোর্টে সফর করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তার কি কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল না? আর যদি না থেকে থাকে, তবে কেন নেই? এর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও কৌশলগত কারণ বা গাফিলতি দায়ী হতে পারে:

 আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতি: নতুন সরকার বা নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনেক সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের (DIP) মধ্যকার সমন্বয়হীনতা ও লালফিতার দৌরাত্ম্যে সময়মতো লাল পাসপোর্ট প্রস্তুত করা সম্ভব হয় না। সফরটি জরুরি বা আকস্মিক হলে এই প্রশাসনিক ব্যর্থতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

প্রশাসনিক অসচেতনতা ও অতি-সরলীকরণ: অনেক সময় সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা মনে করতে পারেন যে, সাধারণ পাসপোর্টে ভ্রমণ করলেও যেহেতু সরকারি জিও (Government Order) বা অফিশিয়াল ‘নোট ভার্বাল’ (Note Verbale) সাথে আছে, তাই হয়তো বড় কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যে কাগজের চেয়ে "পাসপোর্টের রঙ" বেশি প্রটোকল নির্ধারণ করে—এই প্রশাসনিক অতি-সরলীকরণের মাসুল দিতে হয়েছে দিল্লি বিমানবন্দরে।

প্রটোকল উইংয়ের চরম অবহেলা: সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রটোকল উইংয়ের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এখানে স্পষ্ট। একজন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি বিদেশে সরকারি সফরে যাচ্ছেন, অথচ তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট ও প্রটোকল নিশ্চিত না করেই তাকে পাঠানো হয়েছে—এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি বড় ধরণের ‘সিস্টেমিক ফেইলিওর’।


দিল্লি এয়ারপোর্টের ঘটনা ও ভূ-রাজনীতিঃ

দিল্লি এয়ারপোর্টে উপদেষ্টার সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তা চরম নিন্দনীয় এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি। তবে এই ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রটোকলজনিত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একে দেখতে হবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান চড়াই-উতরাইপূর্ণ সম্পর্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে।

ভারতের ‘বিগ ব্রাদার’ সুলভ এবং মাঝে মাঝে আগ্রাসী আচরণ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। বিশেষ করে, গণঅভ্যুত্থানে পতন হওয়া ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা স্বদেশে অসংখ্য খুনের মামলার সাজাপ্রাপ্ত ও পরোয়ানাভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও তাকে ভারতে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, সীমান্তে ‘পুশইন’ ও ‘পুশব্যাক’-এর মতো সংবেদনশীল ইস্যু তৈরি করে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধানোর ফন্দিফিকির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপির চৌকশ, দূরদর্শী ও জাদুকরী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভারতের সাথে একটি শান্তিপূর্ণ, মর্যাদাশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যকে নস্যাৎ করতে দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা শত্রু রাষ্ট্রের অনুচরেরা নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব বাধানো এবং বর্তমান সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করাই এই চক্রের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।


ত্রিমুখী দায় ও গভীর অনুসন্ধানের দাবিঃ

এমন একটি সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপদেষ্টা ডাঃ জাহেদ উর রহমানের সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে সরকারি সফরে যাওয়া, সেখানে হেনস্থার শিকার হওয়া এবং পরবর্তী প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই গভীরভাবে খতিয়ে দেখা আবশ্যক। এই ঘটনার পেছনে তিনটি দিক নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন:

১. উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত: কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি সাধারণ পাসপোর্টে সরকারি সফরে গেলেন? আর না থাকলে কেন সফরের আগে তা নিশ্চিত করা হলো না?

২. দূতাবাসের ভূমিকা: দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের পূর্বনির্ধারিত প্রটোকল ও দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি করেছিল কিনা? তারা কেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে আগেই সমন্বয় করেনি?

৩. ভারত সরকারের আচরণ: ভারত সরকারের এই চরম বিমাতা সুলভ আচরণ কি কেবলই প্রটোকলজনিত ত্রুটি, নাকি এর পেছনে বর্তমান বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে ছোট করার কোনো সুগভীর কূটনৈতিক বার্তা বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে?


দিল্লি বিমানবন্দরে যে অপমান করা হয়েছে, তা কোনো একক ব্যক্তির ওপর নয়; কারণ সাধারণ পাসপোর্টে গেলেও তিনি বাংলাদেশের অফিশিয়াল রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলেন। ফলে এই আঘাত ছিটকে পড়েছে আমাদের ১৬ কোটি মানুষের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার ওপর। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে একজন ‘সাধারণ নাগরিক’ হিসেবে গণ্য করে মূলত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।

এই অপমানের দায় কার—তা উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি। সরকারকে এখনই কূটনৈতিক চ্যানেলে জোরদার তদন্ত ও প্রতিবাদের মাধ্যমে এই ঘটনার পেছনের মূল রহস্য উন্মোচন করতে হবে। একই সাথে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ত্রুটিগুলো দূর করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশকে এভাবে মর্যাদা সংকটে পড়তে না হয়।


লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।

See More

Latest Photos