একদিন হঠাৎ করেই আপনার শান্ত-স্বভাবের সন্তানটি হয়তো খুব সহজেই রেগে যাচ্ছে, কখনও অকারণেই মন খারাপ করছে, আবার কিছুক্ষণ পরই হাসছে। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাচ্ছে, নিজের ঘরে বেশি সময় কাটাতে চাইছে কিংবা নিজের চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে পড়ছে। অনেক অভিভাবকই ভাবেন, বাচ্চাটা এত বদলে গেল কেন? আসলে এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বয়সন্ধিকালের স্বাভাবিক অংশ। এই সময় শরীরে যেমন দ্রুত পরিবর্তন আসে, তেমনি মস্তিষ্ক ও আবেগেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তাই সন্তানকে বকাঝকা না করে, তার পরিবর্তনগুলো বোঝার চেষ্টা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বয়সন্ধিকাল কী? সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১৩ বছর বয়সে এবং ছেলেদের ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সে বয়সন্ধিকাল শুরু হতে পারে। এই সময় শরীর বিভিন্ন হরমোন তৈরি করতে শুরু করে, যা ধীরে ধীরে একজন শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে নিয়ে যায়।
হরমোনাল পরিবর্তন কীভাবে বুঝবেন,বয়সন্ধিকালে আপনার সোনামনি: আর কীভাবে পাশে থাকবেন?
সহজভাবে বললে, হরমোন হলো শরীরের "বার্তাবাহক"। এগুলো মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে সংকেত পাঠায়-কখন লম্বা হতে হবে, কখন কণ্ঠস্বর বদলাবে, কখন মাসিক শুরু হবে বা শরীরে নতুন পরিবর্তন আসবে।
কেন এত মুড সুইং হয়?
ধরুন, আপনার বাড়ির বিদ্যুতের ভোল্টেজ যদি বারবার ওঠানামা করে, তাহলে অনেক যন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করবে না। একইভাবে হরমোনের ওঠানামার কারণে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশও কিছু সময় অস্থির হয়ে পড়তে পারে।
ফলে সন্তান-
হঠাৎ রেগে যেতে পারে।
খুব সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
ছোট বিষয়েও কষ্ট পেতে পারে।
একা থাকতে চাইতে পারে।
আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে।
এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক এবং সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।
ছেলে ও মেয়েদের শরীরে কী কী পরিবর্তন আসে?
মেয়েদের ক্ষেত্রে স্তনের বৃদ্ধি, উচ্চতা দ্রুত বাড়া, শরীরে লোম গজানো এবং মাসিক শুরু হওয়া স্বাভাবিক পরিবর্তন।
ছেলেদের ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বর ভারী হওয়া, পেশি শক্তিশালী হওয়া, মুখে দাড়ি-গোঁফ ওঠা, উচ্চতা দ্রুত বাড়া এবং শরীরে লোম বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।
উভয়ের ক্ষেত্রেই ঘাম বেশি হওয়া, শরীরের গন্ধ পরিবর্তন, ব্রণ এবং ত্বকে তেলতেলে ভাব দেখা দিতে পারে।
একটি বাস্তব উদাহরণ ধরুন, ১৩ বছরের রিমা আগে পরিবারের সবার সঙ্গে গল্প করত। এখন সে নিজের ঘরে থাকতে পছন্দ করে এবং ছোটখাটো বিষয়েও বিরক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে ১৪ বছরের রাফি হঠাৎ নিজের উচ্চতা, ওজন এবং চেহারা নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিবর্তনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বয়সন্ধিকালের স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তনের অংশ। তাই তাদের "অসভ্য" বা "অবাধ্য" বলার পরিবর্তে ধৈর্য নিয়ে কথা বলা বেশি কার্যকর।
অভিভাবক হিসেবে কী করবেন?
প্রথমেই সন্তানের কথা মন দিয়ে শুনুন। সে কথা বললে মাঝপথে থামিয়ে না দিয়ে পুরোটা শুনুন।
তার অনুভূতিকে ছোট করবেন না। "এগুলো কিছু না" বলার বদলে বলুন, "আমি বুঝতে পারছি, তুমি অস্বস্তি অনুভব করছ।"
শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য দিন। মাসিক, স্বপ্নদোষ, ব্রণ বা শরীরের পরিবর্তন নিয়ে লজ্জা নয়, স্বাভাবিক আলোচনা হওয়া উচিত।
প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানোর অভ্যাস তৈরি করুন। এতে সন্তান মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করে।
খাবার ও ঘুমের গুরুত্ব
এই সময় শরীর দ্রুত বেড়ে ওঠে। তাই প্রতিদিন সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি, ফল, শাকসবজি, ডিম, মাছ, দুধ এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা দরকার। পর্যাপ্ত ঘুম হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
বর্তমানে অনেক কিশোর-কিশোরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবন দেখে নিজের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। সন্তানকে বোঝান, ইন্টারনেটে দেখা সব ছবি বা ভিডিও বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়। নিজের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ব্যক্তিত্বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
যদি সন্তান দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত বিষণ্ন থাকে, খাওয়া বা ঘুমের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আসে, নিজের ক্ষতি করার কথা বলে, হঠাৎ পড়াশোনা বা দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি ব্যাহত হয়ে যায় অথবা বয়স অনুযায়ী শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে অস্বাভাবিক উদ্বেগ দেখা দেয়, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ, কিশোর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।