মরক্কোর স্বপ্নের কারিগর উনাহির দুই পায়ে নতুন ইতিহাস

Total Views : 13
Zoom In Zoom Out Read Later Print

বিশ্বকাপের মহামঞ্চে আজ্জেদিন উনাহি মরক্কানদের আত্মবিশ্বাসও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিরল ফুটবলার উনাহি শেষ ষোলোর লড়াইয়ে কানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের দরজাও খুলে দিয়েছেন। উনাহি আজ মরক্কোর স্বপ্নের অন্যতম স্থপতি।

২০০০ সালের ১৯ এপ্রিল কাসাব্লাঙ্কায় জন্ম নেওয়া উনাহির শৈশব ছিল সাধারণ। ফুটবলের প্রতি অদম্য ভালোবাসাই ছিল তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। কৈশোরে তিনি পাড়ি জমান ফ্রান্সে। সেখানেই শুরু হয় কঠিন সংগ্রাম। 

প্রতিষ্ঠিত একাডেমির আলো ঝলমলে পথ নয়, কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা আর নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করার লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠেন তিনি। পরিবারের সমর্থন আর নিজের অদম্য মানসিক শক্তিই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় স্বপ্নের পথে।

উনাহির ফুটবল শিক্ষা শুরু হয় মরক্কোর বিখ্যাত রাজা ক্লাবের একাডেমিতে। পরে তিনি যোগ দেন মোহাম্মদ ষষ্ঠ ফুটবল একাডেমিতে। ফ্রান্সে গিয়ে স্ট্রাসবুর্গের দ্বিতীয় দলে খেললেও খুব বেশি সুযোগ পাননি। অ্যাভরঁশে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। সেই পারফরম্যান্স তাকে নিয়ে যায় আঁজেতে। 

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে দুর্দান্ত নৈপুণ্যের পর যোগ দেন অলিম্পিক মার্সেইয়ে। গ্রিসের প্যানাথিনাইকোসে ধারে খেলে নজর কাড়েন এবং ২০২৫ সালে স্পেনের লা লিগার ক্লাব জিরোনায় যোগ দেন। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম পরিপূর্ণ মিডফিল্ডারে পরিণত করেছে।  

জাতীয় দলের জার্সিতে উনাহির উত্থান যেন রূপকথার মতো। কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে মরক্কোকে সেমিফাইনালে তুলতে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। স্পেন ও পর্তুগালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তার নৈপুণ্য বিশ্ব ফুটবলের নজর কেড়েছিল। 

স্পেনের তৎকালীন কোচ লুইস এনরিকে পর্যন্ত ম্যাচ শেষে উনাহির খেলার প্রশংসা করেছিলেন। সেই বিশ্বকাপ থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় তারকাদের কাতারে জায়গা করে নেন।  

চলতি বিশ্বকাপে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন উনাহি। মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে আক্রমণ তৈরি এবং প্রয়োজনে নিজেই গোল করে তিনি হয়ে উঠেছেন মরক্কোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অস্ত্র।

হিউস্টনের সেই রাতটি ছিল পুরোপুরি উনাহির। প্রথমার্ধে গোলশূন্য লড়াইয়ের পর দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৫০তম মিনিটে আশরাফ হাকিমির নেওয়া নিচু ফ্রি-কিক থেকে আসা বল বক্সের বাইরে পেয়ে প্রথম স্পর্শেই ডান পায়ের দুর্দান্ত নিচু শটে কানাডার জাল কাঁপিয়ে দেন তিনি। 

৮২তম মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে আবারও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন। উনাহির জোড়া গোল তাঁকে ম্যাচের অবিসংবাদিত নায়কে পরিণত করে।

ম্যাচ শেষে উনাহি বলেন, ‘এটি সহজ ম্যাচ ছিল না। কানাডা আমাদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। আমরা দ্বিতীয়ার্ধে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছি। আমরা এখানেই থামতে চাই না।’

মরক্কোর প্রধান কোচ মোহাম্মদ উয়াহবির কথা, ‘উনাহিকে আরও আক্রমণাত্মক ভূমিকায় খেলানোর সিদ্ধান্তই সাফল্যের অন্যতম কারণ। আমরা জানতাম উনাহি প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে পারে। তাই তাকে একটু সামনে খেলিয়েছি। সে আমাদের আস্থার প্রতিদান দিয়েছে।’

উনাহির পারফরম্যান্স দেখে ফুটবল বিশ্লেষকদেরও প্রশংসা থামছে না। তিনি শুধু মরক্কোর নয়, বিশ্বের অন্যতম সেরা বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার। কানাডার বিপক্ষে তিনটি গোলের মধ্যে দুটি এসেছে তাঁর পা থেকে, আর পুরো ম্যাচে তিনি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছিলেন। মরক্কোর ক্লিনিক্যাল ফুটবলের প্রতীক হয়ে উঠেছেন এই ২৬ বছর বয়সী তারকা।  

হিউস্টনের গ্যালারিতে তখন এক অন্য দৃশ্য। হাজারো মরক্কান সমর্থকের কণ্ঠে একটাই ধ্বনি—“উনাহি… উনাহি…”। কেউ আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ সিজদায় লুটিয়ে পড়েছেন, কেউ জাতীয় পতাকা কাঁধে নিয়ে নেচেছেন। মনে হচ্ছিল, এই একজন ফুটবলারই যেন কোটি মানুষের স্বপ্নকে নতুন করে ডানা মেলে দিয়েছেন।

আধুনিক ফুটবলে মিডফিল্ডারদের কাজ শুধু রক্ষণ সামলানো নয়,খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করাও। উনাহি এই তিনটি কাজই সমান দক্ষতায় করেন।

মরক্কোর কোটি সমর্থকের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখন আজজেদিন উনাহি। বড় মঞ্চে যখন একজন নায়কের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়, তখনই জ্বলে ওঠেন এই শান্ত, নিরহংকার মিডফিল্ডার।

হিউস্টনের সেই রাতের ইতিহাসে একটি নাম চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে আজ্জেদিন উনাহি। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা উনাহি একটি জাতির আশা, আত্মবিশ্বাস আর বিশ্বজয়ের স্বপ্নের প্রতীক। তার দুই পায়ে ভর করেই আবারও বিশ্বকাপের আকাশে উড়ছে মরক্কোর লাল পতাকা।

See More

Latest Photos