ডুবে গেছে চট্টগ্রাম টানা ভারি বৃষ্টিতে , জনজীবন বিপর্যস্ত

Total Views : 13
Zoom In Zoom Out Read Later Print

টানা তিন দিনের ভারি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলজটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক, ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল এবং কমে গেছে গণপরিবহণের সংখ্যা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গন্তব্যস্থলে যেতে বাধ্য হওয়া চাকরিজীবী, বিমানবন্দরগামী যাত্রী, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া মানুষ।

৭ জুলাই সকাল থেকে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অফিসগামী অনেককে প্যান্ট গুটিয়ে কিংবা জুতা হাতে নিয়ে হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন। পানিতে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে সড়কের মাঝপথে আটকে পড়ে, ফলে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। এদিকে গণপরিবহণ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকায় বিভিন্ন বাসস্টপে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পরে অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হন।

দুদিন ধরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির পর গতকাল রাত থেকে টানা ভারি বর্ষণ চলছে চট্টগ্রামে। তবে গত দুদিন দলবদ্ধতার সৃষ্টি না হলেও গতরাতে ভারি বর্ষণের কারণে আজ সকাল থেকে বন্দরনগরীর বিভিন্ন এলাকা কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও আবার কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, মহানগরী আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বাদামতলী, কাতালগঞ্জ, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, মোহরা ও পতেঙ্গা এলাকায় বিভিন্ন সড়কে হাঁটুপানি থেকে শুরু করে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমেছে। অনেক স্থানে সড়ক ও নালা একাকার হয়ে যাওয়ায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। কিছু এলাকায় ছোট যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কোথাও কোথাও বাসাবন্দি হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। সড়ক ও ড্রেনের সীমারেখা মুছে যাওয়ায় চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে জিইসির মোড়, দুই নম্বর গেট, ষোলশহর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটে জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি। জলাবদ্ধতার কারণে মহানগরের বিভিন্ন সড়কে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। গণপরিবহণের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকায় অফিসগামী মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও ছিল তুলনামূলক কম, যার প্রভাব পড়েছে পুরো নগরের যোগাযোগ ব্যবস্থায়।

পতেঙ্গা ইস্টার্ন রিফাইনারি গেট এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. ফারুক বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। দোকানে পানি ঢুকে পড়ছে। আমরা এখন ঘরবন্দি অবস্থায় রয়েছি।’

ইপিজেড থানার দক্ষিণ হালিশহর এলাকার আকমল আলী রোডের শিক্ষার্থী আকবর হোসেন জানান, তাদের এলাকায় গতকাল থেকে কোমরসমান পানি জমেছে। ভবনের নিচতলাতেও পানি উঠে গেছে।

গন্তব্য যেতে সড়কে নামা যাত্রীরা অভিযোগ করেন, বহদ্দারহাট থেকে নিউ মার্কেটগামী ২ নম্বর বাসেও যাত্রীদের কাছ থেকে ওঠানামার জন্য ১০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলেও চালক ও তার সহযোগীরা তা আমলে নিচ্ছেন না। দুর্যোগের সময়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

অন্যদিকে, টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবে নগরীর চকবাজার ও বাকলিয়া এলাকার নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। জোয়ারের পানি ও ড্রেন উপচে পড়া নোংরা পানিতে হাজারো মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন।

জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী তাবাসসুম বলেন, সড়কে বন্যার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কলেজে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই বাসায় ফিরে যাচ্ছি।

চকবাজার এলাকার বাসিন্দারা জানান, বন্যার কারণে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তারা কাজে যেতে পারছেন না। তাদের একজন বলেন, ‘রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে থাকায় বাইরে গিয়ে কাজ করার কোনো উপায় নেই।’

এদিকে, পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় আমবাগান এলাকায় ২৫৯ মিলিমিটার এবং পতেঙ্গায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় পতেঙ্গায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে অতি ভারি বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের সতর্কতা জারি রয়েছে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে কর্ণফুলী নদীতে জোয়ার শুরু হওয়ার কথা থাকায় নিচু এলাকায় পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে এবং কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেলে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। পাশাপাশি পাহাড়ঘেঁষা এলাকার বাসিন্দাদের ভূমিধসের ঝুঁকির বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মঙ্গলবার সকালে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাঠে থেকে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং জরুরি সেবার কার্যক্রম তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন।

মেয়র বলেন, তিন দিন ধরে সিটি করপোরেশনের কর্মচারী-কর্মকর্তারা জলাবদ্ধতা নিরসনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বৃষ্টি থেমে গেলে দ্রুত পানি নেমে যাবে।

See More

Latest Photos