হযরত শাহজালাল (র:) সিলহেটী ঐতিহাসিক গবেষণায়

Total Views : 12
Zoom In Zoom Out Read Later Print

হযরত শাহজালাল মুজাররদ (রহ.) ভারতীয় উপমহাদেশের, বিশেষ করে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের প্রধান আধ্যাত্মিক সাধক এবং ইসলাম প্রচারক। ৭০৩ হিজরী (১৩০৩/১৩০৪ খ্রি.) সিলেট বিজয়ের পর তাঁর পরিচয়, জন্মস্থান ও আধ্যাত্মিক ধারা (তরিকত) নিয়ে সমকালীন ইতিহাস গ্রন্থ, পর্যটকদের বিবরণ এবং শিলালিপিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। নিচে সমকালীন ও প্রাচীনতম তিনটি প্রধান উৎসের আলোকে তাঁর ঐতিহাসিক পরিচয় বিশ্লেষণ করা হলো: ১. রিহলায়ে ইবনে বতুতা (Rehla of Ibn Battuta - 1358 AD) সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর অবস্থান এবং ইসলাম প্রচার সম্পর্কে বিশ্ববিখ্যাত মরক্কোর পরিব্রাজক হযরত মুহাম্মদ ইবনে বতুতা (রহ.)-এর ‘রিহলা’ (১৩৫৮ খ্রি.)-এর বর্ণনাটি সর্বাধিক প্রাচীন, প্রত্যক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য দলিল। সাক্ষাৎ ও আতিথেয়তা: ইবনে বতুতা যখন সিলেট অঞ্চলে আসেন, তখন তাঁকে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরবারে অত্যন্ত সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করা হয়। তিনি সিলেটের হযরতের বিশাল খানকাহ শরীফে টানা ৩ (তিন) দিন অবস্থান করেন। খলিফার মর্যাদা লাভ: হযরতের সাথে সাক্ষাৎলাভের পর ইবনে বতুতা তাঁর তরফ থেকে একটি জুব্বা ও টুপি উপহার লাভ করেন, যা তাঁকে একজন সম্মানিত খলিফার (Honorary Representative) মর্যাদা প্রদান করে।

উদ্দেশ্য ও পরিচয়: ইবনে বতুতা সিলেটে আসার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর মূল গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
“My object in going to these mountains was to meet one of the saints living there namely Shaikh Jalaluddin of Tabriz.”
অর্থাৎ, এই পাহাড়ি অঞ্চলে (সিলেটে) আমার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল সেখানে বসবাসরত তবরিজের দরবেশ শায়েখ জালালুদ্দিন এর সাথে সাক্ষাৎ করা।

ধর্ম প্রচার ও খানকাহ পরিচালনা: তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই পাহাড়ি অঞ্চলের অধিবাসীরা হযরতের নিকট ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কারণে তিনি সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যান। খানকাহ পরিচালনায় ভক্তদের দেওয়া উপহার-উপঢৌকন, সদকা ও মান্নতের সমস্ত অর্থ খানকাহ বা ধর্মশালায় বসবাসরত ফকির-দরবেশ এবং মুসাফিরদের সেবায় ব্যয় হতো। হযরত শাহজালাল (রহ.) ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত সংযমী ছিলেন এবং নিজের একটি গাভী থেকে প্রাপ্ত দুধ ব্যতীত অন্য কোনো কিছু নিজের জন্য ব্যবহার করতেন না।

(সূত্র: The Rehla of IBN Battuta - Mahdi Hossain Ph.D. London. Page: 238-240)
২. গুলজারে আবরার ও আইনে আকবরী: ((Gulzar-e-Abrar & Ain-i-Akbari)
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক ধারা ও বংশসূত্র বুঝতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো সুফি ধারা ও মোগল আমলের ইতিহাস গ্রন্থ।
গুলজারে আবরার: সাত্তারি তরিকার বিখ্যাত বুজুর্গ গাউস সাত্তারী মান্ডবি (রহ.) তাঁর গ্রন্থে উপমহাদেশের দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত পীর-দরবেশদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। এই গ্রন্থে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ঘনিষ্ঠ খলিফা এবং তাঁর অধস্তন বংশধর শেখ আলী শের বাঙালির বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে:

Spirituality

হযরত জালালুদ্দিন মজররদ হচ্ছেন তুর্কিস্থানী বংশোদ্ভূত বাঙালি বাসিন্দা।
উক্ত বর্ণনায় তাঁকে কাজাখস্তানের তুর্কিস্তান শহরের প্রখ্যাত পীর খাজা আহমদ ইয়াসাবি (রহ.) তরীকার একজন খলিফা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনে আকবরী: মোগল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজল আল্লামী রচিত আইনে আকবরী (১৫৯০ খ্রি.)-এর ভাষ্যমতে, খাজা আহমদ ইয়াসাবি (রহ.)-এর খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যে তরীকা বিস্তারকারী খলিফা সাঈদ তবরেজী (রহ.)-এর শিষ্য ছিলেন হযরত শাহজালাল (রহ.)।
(সূত্র: ১. হযরত শাহজালাল (র.) দলিল ও ভাষ্য- দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃ. ৫৫-১০৯; ২. আইনে আকবরী ভলিউম-০৩, আবুল ফজল আল্লামী, ইংলিশ অনুবাদ: কর্নেল এইচ. জে. জ্যারেট, ১৯৪৮, পৃ. ৩৯৮, ৪০৬)
৩. হোসেনশাহী আমলের শিলালিপি (Husain Shahi Inscription - 1505 AD)
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর জন্মস্থান ও আদি বাসভূমির সন্ধান মেলে হোসেনশাহী সুলতানদের আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিলালিপিতে।
৯১১ হিজরীর (১৫০৫ খ্রি.) শিলালিপি: সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলের এই ঐতিহাসিক শিলালিপিতে হযরত শাহজালাল (রহ.)-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে:

Islam

“Shaikh Jalal Mujarrad Kanya” অর্থাৎ শায়খ জালাল কুনিয়ার দরবেশ।
(সূত্র: শাহজালাল (র.) দলিল ও ভাষ্য, পৃ. ৩৬৭)
ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সংশ্লেষ (Geographical and Historical Sznthesis)
উপরে উল্লেখিত তিনটি অকাট্য ঐতিহাসিক সূত্রের সমন্বয় ঘটালে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আদি জন্মস্থান ও বংশপরিচয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:
১. কুনিয়া (Kunya): শিলালিপিতে উল্লেখিত ‘কুনিয়া’ বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের ঐতিহাসিক শহর কোনে-উর্গেন্চ (Konye-Urgench) বা প্রাচীন কুনিয়াকে নির্দেশ করে, যা খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল।
২. তুর্কিস্তান ও ইয়াসাবি ধারা: কাজাখস্তানের তুর্কিস্তান শহরে অবস্থিত হযরত আহমদ ইয়াসাবি (রহ.)-এর মাজার শরিফ এবং উজবেকিস্তানের খিবায় অবস্থিত সাঈদ তবরেজী (রহ.)-এর মসজিদ ও তুর্কমেনিস্তানের কুনিয়ায় সুলতান তকিশ ও ইল আরসালানের সমাধিÑএই সমগ্র অঞ্চলটি ত্রয়োদশ শতকের খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।

History

৩. তবরিজি সংযোগ: ইবনে বতুতা বর্ণিত তবরিজ এবং খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের আধ্যাত্মিক যোগসূত্র অত্যন্ত সুদৃঢ়।
আরব-ইয়েমেন তত্ত্বের যৌক্তিক ব্যাখ্যা: আধুনিক যুগের কিছু লেখক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর নামের সাথে ইয়েমেনি সংশ্লিষ্টতাকে ব্যাখ্যা করেন, বিশ্বব্যাপী ধর্ম প্রচারের এক পর্যায়ে তিনি আরব ও ইয়েমেনে ভ্রমণ করেছিলেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। এই সময় আরব ও ইয়েমেনি অঞ্চলের অনেকেই তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তাঁর সাথে সিলেট বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন। এর ফলে পরবর্তীকালে কিছু লেখকদের মধ্যে জনশ্রুতি ‹ইয়েমেনী› পরিচিতিটি জনপ্রিয়তা লাভ করে।

Religion & Belief

সিদ্ধান্ত (Conclusion):উপরে পর্যালোচিত সমকালীন ঐতিহাসিক দলিলপত্র, প্রত্যক্ষদর্শী ইবনে বতুতার বিবরণ, সুফি সিলসিলার বিবরণ এবং হোসেনশাহী আমলের শিলালিপিÑসবগুলো প্রমাণই একযোগে নির্দেশ করে যে, হযরত শাহজালাল মুজাররদ (রহ.) নিশ্চিতভাবেই মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের (বর্তমান তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান সংলগ্ন অঞ্চল) বংশোদ্ভূত একজন মহান দরবেশ ছিলেন।
[তবরিজি (ইবনে বতুতা)] + [তুর্কিস্থানী বংশোদ্ভূত (গুলজারে আবরার)] + [কুনিয়ার দরবেশ (হোসেনশাহী শিলালিপি)]
‘ত্রয়োদশ শতকের ঐতিহ্যবাহী খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য’

লেখক: গবেষক ও ঐতিহাসিক

See More

Latest Photos