দুর্নীতির দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে

Total Views : 26
Zoom In Zoom Out Read Later Print

সারা বিশ্বেই ঘুস ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। পৃথিবীতে হয়তো এমন কোনো দেশ নেই যেখানে দুর্নীতির হার শূন্য ভাগ। অর্থাৎ প্রায় সব দেশেই কমবেশি দুর্নীতির অস্তিত্ব আছে। কোথাও কম, কোথাও বেশি। ঘুস ও দুর্নীতি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থাসহ সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়। ঘুস ও দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাধারণত ঘুস গ্রহণকারীকেই প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে দেখা হয়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানেও অনেক সময় ঘুস গ্রহণকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে আটক, মামলা ও শাস্তির মধ্যেই সাফল্য খোঁজা হয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, ঘুস লেনদেন প্রক্রিয়ায় কি শুধু ঘুস গ্রহণকারী ব্যক্তিই জড়িত থাকেন? এর সঙ্গে কি আর কেউ সংশ্লিষ্ট থাকেন না? শুধু ঘুস গ্রহণকারীকে সরিয়ে দিলে বা শাস্তি দিলেই কি ঘুস ও দুর্নীতির পথ বন্ধ হয়ে যায়? বাস্তবতা সম্ভবত এত সরল নয়। দেশে ঘুস ও দুর্নীতি নিয়ে প্রায়ই যেসব গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তাতে এসব প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুস ও দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রেই কোনো একক ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একাধিক ব্যক্তি, নানামুখী স্বার্থ, দাপ্তরিক পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। একটি ঘুসের ঘটনা ঘটার পেছনে যেমন ঘুসদাবিকারী থাকতে পারেন, তেমনি থাকতে পারেন ঘুস প্রদানকারী, মধ্যস্থতাকারী বা দালাল, অবৈধ সুবিধা পাওয়া ব্যক্তি, ঘুসের অর্থের অংশীদার এবং এমনকি কখনো কখনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এর সঙ্গে জড়িত থাকেন। কারণ অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিজে ঘুস গ্রহণ না করেও অধীনস্থদের অনিয়ম সম্পর্কে জানেন; অথচ তা প্রতিরোধ করেন না। যেসব দপ্তরে ঘুস লেনদেন হয় বলে অভিযোগ ওঠে, সেখানকার দপ্তর প্রধানও যে ভেতরে ভেতরে ঘুস ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নেই, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে ঘুস ও দুর্নীতি বিস্তারের একটি কারণ হতে পারে দুর্বল তদারকি প্রক্রিয়া, অকার্যকর অভিযোগব্যবস্থা, অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তির অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ। ফলে ঘুসের একটি ঘটনা কখনো কখনো একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই ঘুস ও দুর্নীতিকে শুধু ‘ঘুস গ্রহণকারীর অপরাধ’ হিসেবে দেখলে এর গভীরে পৌঁছানো কঠিন হবে। বরং একে দেখতে হবে ঘুস ও দুর্নীতির একটি দুষ্টচক্র হিসেবে।

এই দুষ্টচক্রের শুরুটা যেখানে হয়, সেটা সবসময় একই রকম থাকে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই ঘুস দাবি করছেন। আবার কখনো সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকরা বুঝতে পারেন, ঘুস না দিলে তার ফাইল এগোবে না বা কাজ সম্পন্ন করা সহজ হবে না। কোথাও ঘুসের একটি অংশ চলে যায় অন্য কারও কাছে। কোথাও আবার সরাসরি ঘুস না নিয়েও কেউ এমন পরিবেশ তৈরি করে রাখেন, যেখানে ঘুস ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ঘুসের লেনদেনকে শুধু দুই পক্ষের, অর্থাৎ ঘুসদাতা ও ঘুসগ্রহীতার মধ্যকার সম্পর্ক হিসেবে দেখলে এর একটি বড় অংশ পর্দার আড়ালে থেকে যাবে।

ঘুস নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। ঘুস দেওয়া অবশ্যই দুর্নীতির একটি অংশ এবং আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। তবে ঘুসের বাজার টিকিয়ে রাখার জন্য ঘুসদাতার ভূমিকাও বিবেচনায় নিতে হবে। যদিও সব ঘুসদাতার অবস্থান এক নয়। কেউ কেউ অবৈধ সুবিধা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাবিত করেন, কেউ কেউ কাজ না হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক ভীতি থেকে স্বেচ্ছায় ঘুসের প্রস্তাব দেন; আবার কেউ নিজের ন্যায্য সেবা পাওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে ঘুস দেন। তাই ঘুস ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে শুধু সাধারণ মানুষদের উদ্দেশ্য করে ‘ঘুস দেবেন না’ বললেই হবে না; বরং এমন এক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ঘুস না দিয়েও নাগরিকরা তাদের ন্যায্য সেবা নির্ধারিত সময়ে পেতে পারেন।
অনেক সরকারি ও বেসরকারি সেবার ক্ষেত্রে ঘুসের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী বা দালালচক্রের সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন নাগরিক হয়তো জানেন না কোন টেবিলে তার ফাইল যাবে, কী কাগজ লাগবে, কত দিনে কাজ হওয়ার কথা। এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্থতাকারী নিজেকে অপরিহার্য করে তুলতে নানা রকমের ফন্দিফিকির করে থাকেন। তিনি কখনো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সেবাপ্রার্থীর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী হিসেবে, আবার কখনো দুর্নীতির লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠেন। এভাবেই সাধারণত ঘুসের অর্থের লেনদেন হয়ে থাকে। ফলে শুধু ঘুস গ্রহণকারীকে ধরলেই হবে না; বরং যে ব্যবস্থায় একটি অনানুষ্ঠানিক অথচ ‘অপরিহার্য স্তর’ হিসেবে দালালের আবির্ভাব ঘটে, সেই ব্যবস্থারও পরিবর্তন করতে হবে।

দুর্নীতির দুষ্টচক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া একটি জায়গা হতে পারে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব। একজন দপ্তরপ্রধান নিজে ঘুস গ্রহণ ও দুর্নীতি না করলেও তার অধীনস্থ দপ্তরে যদি ঘুসের লেনদেন চলে, সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে নানা কায়দায় অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকে, দালালদের অবাধ বিচরণ থাকে এবং তিনি তা জানার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেন, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি কোথায়? এর অর্থ এই নয় যে, অধীনস্থ কোনো কর্মচারীর প্রতিটি ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে দপ্তরপ্রধানকে দায়ি করতে হবে। বরং প্রশ্নটি হলো তদারকি, নেতৃত্ব ও জবাবদিহির। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের দায়িত্ব শুধু নিজে দুর্নীতিমুক্ত থাকা নয়; তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব হয়ে ওঠে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাই ব্যক্তিগত সততার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের সততা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

ঘুস ও দুর্নীতির বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত শুধু ঘুসের টাকার লেনদেন নয়, সেটা হলো কর্তৃপক্ষের নীরবতা। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো দপ্তরে ঘুস দাবি করলেও কেউ অভিযোগ করেন না। আবার ঘুস নিয়ে কেউ অভিযোগ করলেও তদন্ত হয় না। তদন্ত হলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়; ফলে একসময় অভিযোগটি হারিয়ে যায়! অনেক সময় শাস্তি হলেও তার খবর ছড়িয়ে পড়ে না। আবার কখনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির হস্তক্ষেপে পুরো তদন্তব্যবস্থা থেমে যায়। এভাবে এমন একটি বার্তা ধীরে ধীরে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ‘এখানে এভাবেই চলে।’ এই ‘এভাবেই চলে’ সংস্কৃতিই দুর্নীতির জন্য ভয়ংকর সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে। সাধারণ মানুষ দুর্নীতিকে অন্যায় হিসেবে দেখলেও যখন সমাজের অনেকেই সেটিকে প্রতিরোধের পরিবর্তে জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেন, তখন দুর্নীতি শুধু প্রশাসনের সমস্যা থাকে না; তা সামাজিক আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। এর ফলে ঘুস ও দুর্নীতির একটি দুষ্টচক্র গড়ে ওঠে। এই দুষ্টচক্রে থাকে অনেকগুলো উপাদান। এসব উপাদানের মধ্যে রয়েছে, ঘুস দাবিকারী, ঘুস প্রদানকারী ও মধ্যস্থতাকারী, ঘুসের অংশীদার, সুবিধাভোগী, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরবতা, দুর্বল নজরদারিব্যবস্থা, অনৈতিক রাজনৈতিক প্রভাব, বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া ইত্যাদি।

যেহেতু ঘুস ও দুর্নীতির দুষ্টচক্রটি একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে টিকে থাকে, তাই এর বিরুদ্ধে লড়াইও হতে হবে বহুমাত্রিক। ঘুস দাবিকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। ঘুসদাতাকে সচেতন করতে হবে এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ দায়েরের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি সেবাকে সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিভিত্তিক করতে হবে। পাশাপাশি দপ্তরপ্রধানের থাকতে হবে কার্যকর জবাবদিহিব্যবস্থা। সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নজরদারিব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। সর্বোপরি ঘুস ও দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বেশি প্রয়োজন। তবে এসব উপায়ের কোনোটি এককভাবে অনুসরণ করে দুর্নীতি নির্মূল করা অনেক কঠিন। বরং ঘুস ও দুর্নীতির দুষ্টচক্রের প্রতিটি উপাদানের পরস্পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে মূল সংযোগ দুর্বল করা সম্ভব হবে। এখানেই দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল নিহিত রয়েছে।

ঘুস ও দুর্নীতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে শুধু আইন ও শাস্তি দিয়ে সবকিছু সমাধান করা সম্ভব নয়। ঘুস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করতে হবে শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে। শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের শুধু নৈতিকতার গল্প শোনালেই হবে না; তাদের বোঝাতে হবে, ঘুস ও দুর্নীতি কীভাবে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের ক্ষতি করে। তাদের সামনে নীতিনৈতিকতার অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আর নাগরিকদের জানতে হবে, তাদের কী কী সেবা কত সময়ের মধ্যে পাওয়ার অধিকার রয়েছে। পাশাপাশি যথাসময়ে সেবা না পেলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং ঘুস দাবি করা হলে কীভাবে প্রতিরোধ করতে হবে, এটাও তাদের জানা জরুরি।

ঘুস ও দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও সহযোগিতা থাকতে হবে। কারণ, দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করা মানে দুর্নীতি বিস্তারে সহায়তা করা বোঝায়। দুর্নীতিবাজ যদি মনে করেন যে, তার পেছনে ক্ষমতাবান কেউ আছেন, তাহলে সবচেয়ে কঠোর আইনও অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। বিপরীতে সাধারণ নাগরিকরা যদি বিশ্বাস করেন যে, তাদের অভিযোগের মূল্য আছে এবং ক্ষমতাবান হলেও অপরাধ করলে জবাবদিহি করতে হবে, তাহলে দুর্নীতির চক্রে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা কোনো অপ্রত্যাশিত বিষয় নয়; বরং এটি দুর্নীতির দুষ্টচক্র ভাঙার পুরো প্রক্রিয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত। সত্যিকার অর্থে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্থায়ী সাফল্য পেতে হলে শুধু দুর্নীতির একটি ঘটনা থামানো নয়, বরং দুর্নীতির দুষ্টচক্রের ঘূর্ণন বন্ধ করতে হবে। আর সে জন্যই প্রয়োজন ঘুষ ও দুর্নীতির দুষ্টচক্রের প্রতিটি উপাদানকে কার্যকরভাবে চিহ্নিত করা এবং এগুলোর সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন করা। অর্থাৎ ঘুষ ও দুর্নীতির পুনরুৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি ভাঙতে হবে পুরো দুষ্টচক্রকে।

See More

Latest Photos