ভারতে তরুণদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন ২৯ বছর বয়সী পিএইচডি গবেষক ও ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপ—বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন তিনি। বারবার আটক হওয়ার পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তরুণদের মধ্যে পরিচিতি পেয়েছেন এই সংগঠক।
বারবার আটক, তবু আন্দোলনে অটল—কে এই নেহা বোরা?
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভে সপ্তাহান্তে একাধিকবার আটক হন নেহা। তবে আটক হওয়ার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
‘আমি আটক, কিন্তু আন্দোলন থেমে নেই’
শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভকারীরা নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তরমন্তরে যেতে চাইলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। এ পরিস্থিতিতে নেহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দিল্লি হাট এলাকায় সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আজ দিল্লি হাটই হয়ে উঠবে যন্তরমন্তর।’
এরপর বিক্ষোভকারীদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে আটক করা হয়। আটক অবস্থায় প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আটক আছি। কিন্তু আন্দোলন থেমে নেই।’ তাঁর এ বার্তা আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশের বাধা ও আটকের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিবাদ কর্মসূচি দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ভোটার তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ এবং পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
ভোটার তালিকা নিয়ে কী অভিযোগ?
নেহা বোরা ও সংশ্লিষ্ট আন্দোলনকারীরা ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিশেষ নিবিড় সংশোধনপ্রক্রিয়ার (এসআইআর) মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং এতে ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই সংখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, তালিকা হালনাগাদের উদ্দেশ্য হলো অযোগ্য ও একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটারের তথ্য শনাক্ত করা। ফলে নাম বাদ দেওয়ার প্রকৃত সংখ্যা, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ভোটারদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
নেহা ও তাঁর সমর্থকেরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের পাশাপাশি ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়ার জবাবদিহি দাবি করছেন। তাঁদের আন্দোলনে ছাত্রসংগঠন ও অন্যান্য অধিকারকর্মীরাও অংশ নিয়েছেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্বের ইস্যুতেও সক্রিয়
নেহার আন্দোলন শুধু নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বিক্ষোভের সময় পুলিশের আচরণ নিয়েও তিনি কথা বলেছেন।
তাঁর বক্তব্যে সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সাধারণত শান্ত ও সংযতভাবে কথা বললেও জনসমাবেশে মাইক্রোফোন হাতে তাঁর দৃঢ় বক্তব্য আন্দোলনকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
উত্তরাখণ্ড থেকে দিল্লির রাজপথে
ভারতের হিমালয়সংলগ্ন উত্তরাখণ্ডে বেড়ে ওঠেন নেহা বোরা। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় শৈশবে পরিবারকে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করতে হয়েছে।
পরে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন এবং আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে পিএইচডি গবেষণা করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি থিয়েটার দলে যোগ দিয়েছিলেন নেহা। অভিনয় ও মঞ্চের অভিজ্ঞতা তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনের ধরন গঠনে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। শিক্ষার্থী আন্দোলন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।
ব্যক্তিগত পরিচিতি ছাড়িয়ে আন্দোলনের মুখ
নেহা বোরা নিজেকে শুরু থেকেই পূর্ণকালীন আন্দোলনকর্মী হিসেবে দেখেননি। কিন্তু শিক্ষার্থী ও তরুণদের বিভিন্ন দাবিকে সামনে রেখে কাজ করতে গিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে থাকা অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA) ভারতের একটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তাঁর বারবার আটক হওয়ার ঘটনা এবং আটক অবস্থাতেও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার আহ্বান তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। তবে আন্দোলনের দাবিগুলোর সত্যতা, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব এবং সরকারি পদক্ষেপের মূল্যায়ন করতে হলে অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও যাচাইযোগ্য তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে।