ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা প্রকাশ করেছে সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নিবন্ধন ও নির্ধারিত লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) সড়কে চলতে পারবে না। পাশাপাশি নির্দিষ্ট রুট, গতি, যাত্রীসংখ্যা, পার্কিং ও চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও মানতে হবে বিভিন্ন বিধিনিষেধ।
লাইসেন্স ছাড়া চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, কার্যকর হচ্ছে নতুন বিধিমালা
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ প্রকাশ করে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ক্ষমতাবলে প্রণীত এই বিধিমালা দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ই-রিকশার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
নিবন্ধন ছাড়া চলবে না ই-রিকশা
বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশা নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি জমা দিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ে সন্তুষ্ট হলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়া হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। এসব নম্বর ই-রিকশার দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে।
আবেদন নামঞ্জুর হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। এ সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন। আপিলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না।
বুয়েটের মানদণ্ড ও ফিটনেস সনদ বাধ্যতামূলক
ই-রিকশার নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি ফিটনেস সনদ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর থাকতে হবে।
প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার অথবা ওডোমিটার স্থাপন করতে হবে। যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাগত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন ই-রিকশা সড়কে চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট সড়ক ও রুটে চলাচল
বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডরে চলতে পারবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব সড়কে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে, সেখানেও ই-রিকশা চালানো যাবে না।
ই-রিকশার চলাচলের জন্য কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট নির্ধারণ করবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় জোনভিত্তিক রুট ব্যবস্থা চালু হবে। এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না।
ই-রিকশা ফুটপাতে চালানো নিষিদ্ধ। চালকদের সব সময় সড়কের বাঁ পাশের লেন অনুসরণ করতে হবে। নিয়মবহির্ভূতভাবে ওভারটেকিং, লেন পরিবর্তন এবং গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার করা যাবে না।
যাত্রী ও গতিসীমায় বিধিনিষেধ
ই-রিকশায় চালক ছাড়া যানবাহনের আকারভেদে সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য ব্যক্তিগত মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না।
ই-রিকশায় ৪০ ডেসিবেলের বেশি তীব্রতার হর্ন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে হবে।
নির্ধারিত স্থানে পার্কিং ও চার্জিং
ই-রিকশা পার্কিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিটি ওয়ার্ড বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণ করবে কর্তৃপক্ষ।
ব্যাটারি চার্জ দিতে হবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত এবং সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজে। এসব স্থানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বিধিমালায় অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মবহির্ভূত চার্জিং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে সংশ্লিষ্ট প্রচলিত আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিবন্ধনের মেয়াদ ও আয়ুষ্কাল ১২ বছর
বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বা ‘ইকোনমিক লাইফটাইম’ হবে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর। এই মেয়াদ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করা হবে।
এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাকে বিমার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অবৈধ ই-রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে অথবা পৃথকভাবে অবৈধ ই-রিকশা চলাচল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
নতুন বিধিমালার মাধ্যমে নিবন্ধন, নিরাপত্তা, চলাচলের রুট, গতি, পার্কিং ও চার্জিং ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।