মুসলিম উম্মাহ .ইরান যুদ্ধ কি কেবল দর্শক হয়েই থাকবে?

Total Views : 4
Zoom In Zoom Out Read Later Print

স্মৃতিটা ১৯৮৩ সালের। সাবেক যুগোস্লাভ নৌ বাহিনীর প্রশিক্ষণ জাহাজ ‘গালেব’-এ চড়ে আমরা পাড়ি দিচ্ছি নীল ভূমধ্যসাগর। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দিগন্তজোড়া জলরাশি দেখতে দেখতে আমরা মেতে উঠতাম নাবিকদের এক রোমান্টিক ও প্রাচীন ঐতিহ্যে। কাঁচের স্বচ্ছ বোতলে পরম মমতায় ভরে দিতাম মা-বাবার কাছে লেখা চিঠি। সাথে থাকতো একটি মাত্র ডলার, যাতে সিসিলি বা ইতালির কোনো সহৃদয় জেলে যদি বোতলটি খুঁজে পায়, তবে যেন সেই ডলার দিয়ে স্থানীয়ভাবে ডাকটিকিট কিনে চিঠিটি গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয়। আশ্চর্য হলেও সত্য, সাগরের নোনা জলরাশি পাড়ি দিয়ে সেই বোতলগুলো ঠিকই বাংলাদেশে আমার মা-বাবার হাতে পৌঁছেছিল। মাসের পর মাস লোনা পানিতে ভেসে থাকলেও চিঠির একটি অক্ষরও অস্পষ্ট হয়নি। কারণ, বোতলের মুখে লাগানো সেই ‘কর্ক’ বা ছিপিটি ছিল বিশ্বাসের মতোই অভেদ্য। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আধুনিক জিপিএস আর রাডারের ভিড়ে সেই রোমাঞ্চ হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু সেই ‘অভেদ্য ছিপি’ আজও আমার স্মৃতিতে অক্ষত, যা আধুনিক মুসলিম উম্মাহর হারানো ঐক্যের এক জীবন্ত রূপক।

নৌ-পথের নিরাপত্তা ও আধিপত্য বিস্তারের গুরুত্ব ইসলামি খিলাফতের শুরু থেকেই অনুধাবন করা হয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয় তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাসনামলে (২৮ হিজরি/৬৪৯ থেকে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ)। সিরিয়ার তৎকালীন গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.)-এর প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সমুদ্র-আক্রমণ মোকাবিলা করতে এই নৌবহর গঠন করা হয়। এই নৌবাহিনীর প্রথম বড় সাফল্য ছিল সাইপ্রাস বিজয়। তবে এর চেয়েও বড় মাইলফলক ছিল ৬৫৫ খ্রিস্টাব্দের ‘জাতুস সাওয়ারি’ বা মাস্টসের যুদ্ধ, যেখানে মুসলিম নৌবাহিনী বাইজান্টাইন সম্রাট কনস্ট্যান্স দ্বিতীয়কে পরাজিত করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মুসলিমদের নৌ-আধিপত্য নিশ্চিত করে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে নৌশক্তিই ছিল বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার প্রধান চাবিকাঠি। আজ ২০২৬ সালেও সেই গুরুত্ব কমেনি। হরমুজ প্রণালী আজ বিশ্ব রাজনীতির স্নায়ুকেন্দ্র। তেলের এই প্রধান ধমনীর নিয়ন্ত্রণ পেতে পশ্চিমা শক্তিগুলো মরিয়া। কারণ, এটি অচল হওয়া মানে বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস ওঠা। ইরান এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে, যা পশ্চিমা শক্তির জন্য এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ।

মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি দেশগুলোর রাজতন্ত্র আজ এক ভয়াবহ ফাঁদে বন্দি। ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই দেশগুলো তেলের বিনিময়ে ডলার গ্রহণ এবং সেই ডলার মার্কিন ব্যাংকে বিনিয়োগ করার চুক্তিতে আবদ্ধ। বিনিময়ে আমেরিকা তাদের রাজতন্ত্র রক্ষার গ্যারান্টি দিয়েছে। এই সুরক্ষার আড়ালে মূলত জিসিসি দেশগুলো তাদের সার্বভৌমত্ব পশ্চিমাদের কাছে বন্ধক রেখেছে। বাহরাইন, কাতার বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে স্থাপিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো কেবল ইরানকে ঠেকানোর জন্য নয়, বরং এই রাজতন্ত্রগুলোকে ধরে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়। আমেরিকা ও ইসরাইল আজ এই রাজতন্ত্রগুলোর পাহারাদার। ফলে কোনোভাবেই এই শাসকরা তাদের গদি হারাতে চায় না এবং সে কারণেই তারা ইরানের কট্টর বিরোধী।
মুসলিম উম্মাহর এই চরম অনৈক্যের যুগে আমরা একজন সাহসী ও দূরদর্শী নেতার অভাব তীব্রভাবে অনুভব করছি। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ ছিলেন সেই বিরল নেতাদের একজন, যিনি পশ্চিমাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতেন এবং মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার কথা প্রচার করতেন। মাহাথির জানতেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিমরা প্রযুক্তি, নৌশক্তি ও অর্থনীতিতে স্বনির্ভর না হবে, ততক্ষণ তাদের ওপর পশ্চিমাদের ছড়ি ঘোরানো বন্ধ হবে না। মাহাথিরের মতো নেতৃত্বের অভাবেই আজ ইরানের মতো দেশগুলোকে একাকী লড়তে হচ্ছে।

মুসলিম উম্মাহর একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তানও আজ পশ্চিমাদের গভীর ষড়যন্ত্রের লক্ষ্যবস্তু। আমেরিকা ও তার মিত্ররা কখনোই চাইবে না একটি শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী থাকুক। ইরানকে দমানোর পর পশ্চিমাদের পরবর্তী টার্গেট হবে পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক করা। কেবল পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের মতো উদীয়মান মুসলিম দেশগুলোকেও আজ বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বুঝে নিজেদের নৌশক্তিকে আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে আমাদের সমুদ্রসীমা ও সার্বভৌমত্ব অন্যের দয়ায় ছেড়ে দিতে না হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন সাধারণ মুসলিমদের লাশের মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে, তখন কেবল নিন্দা জ্ঞাপন করে দায় মেটানোর সময় আর নেই। যেসব দেশে মুসলিমরা শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত এবং সামরিকভাবে সামর্থ্যবান, তাদের এখনই ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইরান আজ সেই প্রতিরোধের অগ্রভাগে রয়েছে। কিন্তু কেবল ইরান একা নয়, উম্মাহর যেসব জনগোষ্ঠীর মাঝে এখনও শাহাদাতের চেতনা জীবন্ত, তাদের এখনই ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে হবে। আরব রাজতন্ত্রগুলো পশ্চিমা চাপের কারণে মুখ খুলতে ভয় পায়, কিন্তু মুসলিম জনগণ যদি জাগরিত হয় এবং তাদের শাসকদের কোরআনি বিধান (৪:৫১) মানতে বাধ্য করে, তবেই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। এই দেশগুলোকে বুঝতে হবে যে, ইসরাইলের ‘গ্রেটার ইসরাইল’ পরিকল্পনা তাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। আজ যদি তারা ফিলিস্তিন বা ইরানকে একলা ছেড়ে দেয়, তবে কাল তাদের গদিও রক্ষা পাবে না। এখনই সময় শক্তির ভারসাম্য তৈরি করার, যাতে জালেমরা মুসলিমদের রক্ত ঝরানোর আগে দশবার ভাবে।

কোরআনুল কারিমের সূরা মায়েদার ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না; তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।’ এই চিরন্তন নির্দেশের বিপরীতে আরব রাজতন্ত্রের শাসকরা আজ নিজেদের গদি রক্ষা আর আমেরিকার ‘নিরাপত্তা ছাতা’র নিচে আশ্রয় নিতে গিয়ে সরাসরি আল্লাহর আয়াত ও মুসলিম উম্মাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। আজ আরব রাজতন্ত্রগুলো পশ্চিমাদের ‘টিস্যু পেপার’ এর মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের বুঝতে হবে, দীর্ঘ বহু বছর ধরে আমরা কেবল হাত তুলে যে মোনাজাত বা দোয়া করে আসছি, বাস্তব পদক্ষেপ ও ঐক্য ছাড়া সেই দোয়া উম্মাহর ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাবে না। এই পরিস্থিতিতে আরব জনগণকে আজ জাগতে হবে। তারা যদি তাদের এই পুতুল শাসকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয় এবং রাজতন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন না করে, তবে এই শাসকরা আজীবন ইহুদি ও খ্রিস্টানদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে যাবে। শুধু দোয়ার ওপর নির্ভর করে নিষ্ক্রিয় বসে থাকলে উম্মাহর পতন অনিবার্য, যা আমাদের সূরা ফাতিহার শেষ আয়াতের সেই ‘ক্রোধে পতিত’ (মাগদূবি-ইহুদি) ও ‘পথভ্রষ্ট’ (দোয়াল্লীন-খ্রিস্টান) পথে উম্মাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেবে।

আমেরিকা যে ‘এককেন্দ্রিক বিশ্ব’ বজায় রাখতে মরিয়া, ইরানের এই সংকট মূলত সেই দাবারই একটি অংশ। এটি রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার সাথেও যুক্ত। চীন তার জ্বালানি তেলের জন্য ইরান ও হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ইরানকে অস্থিতিশীল করতে পারলে চীন ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি খর্ব করা সহজ হবে। এই লড়াইয়ে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার সুন্নি হামাসকে সাথে নিয়ে যে প্রক্সি যুদ্ধ চালাচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে শাহাদাতের চেতনা কোনো মাযহাবের সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। শিয়া সুন্নি কৃত্রিম বিভেদ কেবল মোসাদ ও সিআইএ’র তৈরি একটি মারণাস্ত্র। অথচ ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ তীব্র বিভাজন ভুলে গিয়ে বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

একটি সাধারণ কাঁচের বোতল যেমন শক্ত ছিপি থাকার কারণে উত্তাল সমুদ্রের নোনা জল থেকে নিজের ভেতরের চিঠিখানি রক্ষা করতে পেরেছিল, ঠিক তেমনি মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষা আজ আমাদের ঈমানি দৃঢ়তা এবং শক্তিশালী নৌ-আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল। হযরত উসমান (রা.) এর আমলের সেই সাহসী নৌ অভিযান আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমুদ্রপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছাড়া উম্মাহর সার্বভৌমত্ব রক্ষা অসম্ভব। আবাবিল পাখি আমাদের অলসতায় ডানা মেলবে না; আমাদেরই উদ্যোগী হতে হবে। আজ সময় এসেছে দ্বাদশ শতাব্দীর সেই মহান বীর সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর মতো আপসহীন ও দূরদর্শী নেতৃত্বের, যিনি খ--বিখ- উম্মাহকে এক সুতায় গেঁথে ক্রুসেডারদের হাত থেকে জেরুজালেম মুক্ত করেছিলেন। ড. মাহাথির মোহাম্মদের আধুনিক চিন্তা কিংবা পারস্যের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী তেজস্বী চেতনা ও আরব বিশ্বের প্রকৃত লড়াকু ঐতিহ্যের সমন্বয়ে আজ একজন নতুন ‘সালাহউদ্দীন’ প্রয়োজন। ইরানের বর্তমান সংগ্রাম হয়তো সেই নতুন নেতৃত্বের সোপান তৈরি করছে।


পবিত্র কোরআনের সূরা আর-রা’দ-এর ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (১৩:১১)। এখন ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে এবং আইয়ুবী শৌর্য পুনরুদ্ধার করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়াই এখন সময়ের দাবি। নিজেদের অভ্যন্তরীণ ‘ছিপি’ বা ঐক্যের বাধা আমাদেরই খুলতে হবে। কারণ, শুধু দোয়ার ওপর নির্ভর করে নিষ্ক্রিয় বসে থাকলে উম্মাহর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়া অনিবার্য, যা আমাদের সূরা ফাতিহার সেই ‘ক্রোধে পতিত’ ও ‘পথভ্রষ্ট’ পথে উম্মাহকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে দেবে এবং গত বহু বছর ধরে উম্মাহ যেভাবে সীমাহীন কষ্ট ও লাঞ্ছনা ভোগ করে আসছে, সেই একই যন্ত্রণার পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে।

See More

Latest Photos