ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ঘটনাকে ‘নরকে ব্যয়বহুল অভিযান’ আখ্যা দিয়েছেন তিনি। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে এক যুগের লড়াইয়ের ইতি ঘটল। খবর আরব নিউজের। বাগদাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার এক চুক্তির আওতায় উত্তর ইরাকের একটি বিমানঘাঁটি থেকে অবশিষ্ট মার্কিন সেনারা চলে যায়।
ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর ট্রাম্প বললেন ‘নরকে ব্যয়বহুল অভিযান’
৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমার মধ্যে ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে ‘সুশৃঙ্খল’ আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘অনেক সময় পেরিয়েছে; অত্যন্ত বাজে সিদ্ধান্তের কারণেই আমরা প্রথমে এই গোলকধাঁধায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। তবে শিগগিরই তা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে।’
তিনি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের বিজয় এবং দায়েশ (আইএস) গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জয়ের নিদর্শন।
দুই বছর আগেই ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আর সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাটি এমন এক প্রেক্ষাপটে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ইরাকেও ছড়িয়েছে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। জবাবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটিতে হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দৃষ্টি হঁটিয়ে এশিয়ায় মনোনিবেশের চেষ্টা করেছে বলে মনে হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতার অভাব ছিল। পেন্টাগন একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপস্থিতি কমানোর চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে নতুন নতুন সংঘাতে বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
ইরাক মার্কিন অভিযানের সম্পাপ্তিকে দেশটির ক্রমবর্ধমান শক্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কাছে আনন্দের হলেও অন্য অনেক ইরাকি বিশেষ করে কুর্দিদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাদের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর আইএস পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে, ইরাকি মিলিশিয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাগদাদ তাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত খুব একটা সাফল্য পায়নি।
ইরাকে নতুন অধ্যায়
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের ইরবিল বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা ও সরঞ্জাম ‘সুশৃঙ্খলভাবে প্রত্যাহার’ সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মাইলফলকটি ১২ বছরব্যাপী অভিযানের সাফল্যকে তুলে ধরেছে, যার মধ্য দিয়ে ইরাক ও এ অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা দায়েশ (আইএস) পরাজিত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, মার্কিন সেনাবাহিনী ইরাকি অংশীদারদের সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখবে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে একটি ’নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে এবং সরকার নিশ্চিত করবে যেন রাষ্ট্রবহির্ভূত কোনো গোষ্ঠীর হাতে আর অস্ত্র না থাকে।
সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনী ইরাকে অভিযান শুরু করে। ২০১১ সালে ইরাক ছাড়ে মার্কিন বাহিনী। তবে তিন বছর পর ইরাকি কর্তৃপক্ষ আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য মার্কিন বাহিনীকে আমন্ত্রণ জানায়। কারণ তত দিনে আইএস ইরাকের বিশাল এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।
চরমপন্থি গোষ্ঠীটি এখন বিচ্ছিন্ন কিছু ‘স্লিপার সেলে’ পরিণত হওয়ায়, ওয়াশিংটন ও বাগদাদ ২০২৪ সালে অভিযানের ইতি টানার বিষয়ে সম্মত হয়। অবশেষে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করে নিলে যুক্তরাষ্ট্র।