উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গত শনিবার শুরু হয়ে রোববার সমাপ্ত হয়েছে। শনিবারই ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ নামে সম্মেলনের ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছে সদস্য দেশগুলো। ঘোষণায় যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ ও একতরফা শুল্কব্যবস্থার নিন্দা জানানো হয়েছে। এই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বিশ্ববাণিজ্যব্যবস্থার পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, নয়াদিল্লি ঘোষণা বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ বার্তা বহন করে। পশ্চিমাদের যুদ্ধবাদী নীতি, সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা, অর্থনৈতিক শোষণ ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার প্রতি এ ঘোষণা একটি ঐক্যবদ্ধ শক্ত প্রতিবাদ। নানা কারণে ব্রিকসের এই শীর্ষ সম্মেলন আন্তর্জাতিক পরিম-লে বহুল আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এর কারণ প্রথমত, এই জোটটি গড়ে উঠেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর যৌথ সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার জন্য। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প তৈরি করতে। তৃতীয়ত, বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে। চতুর্থত, ডলারের একাধিপত্য খর্ব করে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে। এই জোটের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধনে সহযোগিতা করা। এজন্য জোটের তরফে ইতোমধ্যে নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ব্যাংকটি সদস্য দেশগুলোকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঋণ প্রধান করছে। ব্রিকস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা জোটে যোগ দেয়। কিন্তু এখন এই পাঁচটি দেশের মধ্যে এ জোটের পরিধি সীমাবদ্ধ নেই। ইতোমধ্যেই এ জোটে যোগ দিয়েছে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, সউদী আরব ও সংযুক্ত আরব ও আমিরাত। এছাড়া এই জোটের সঙ্গে বেলারুস, বলিভিয়া, কাজাখস্থান, কিউবা, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম অংশীদার হিসাবে যুক্ত রয়েছে। বলা বাহুল্য, যে কোনো বিচারে ব্রিকস বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জোটে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই জোট বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ ও বৈশ্বিক জিডিপির ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৯ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। কাজেই, এই জোটকে এড়িয়ে যাওয়ার শক্তি এখন বিশ্বের কোনো জোটশক্তিরই নেই।
ব্রিকসের অপার সম্ভাবনা পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পরাশক্তি। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও তার অবস্থান প্রথম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক পরাশক্তি হিসাবে তার অবনমন ঘটেছে। আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও সর্বশেষ ইরান যুদ্ধে তার শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও সে এখন ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। চীন তার অবস্থান দখল করতে জোর কদমে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোট হিসাবে একদা শক্তিশালী হলেও এখন দুর্বল এবং পরস্পর বিচ্ছিন্নতার শিকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হরিহর সম্পর্ক এখন আর আগের মতো নেই। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবের মাত্রাও কমেছে। বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রভাবশালী দু’টি জোট হলো, জি-৭ এবং জি-২০। জি-৭-এ আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ১৯৭৫ সালে জি-৭ প্রতিষ্ঠিত হয় মূলত উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি সুরক্ষার জন্য। জি-২০ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এ জোট গঠিত হয়। জি-৭ ও ব্রিকসের সদস্য ছাড়াও এ জোটে রয়েছে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, তুরষ্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকান ইউনিয়ন। বলা আবশ্যক, নানা কারণে জি-৭ এবং জি-২০ বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। এ কারণে জোট দু’টির গুরুত্ব দিনকে দিন হ্রাস পাচ্ছে। বাস্তবতার এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের সম্ভাবনা অপার। ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রাপ্ত সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে ব্রিকস বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জোটে পরিণত হবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
আগামী বছর ব্রিকসের নেতৃত্ব দেবে চীন। শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। রোববার সম্মেলনের সমাপনী দিনে শি জিন পিং বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একক আধিপত্যের তীব্র বিরোধিতা করেন। বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন কোনো একটি দেশ বা গোষ্ঠীর ইচ্ছায় চাপিয়ে দেয়া যায় না। বিশ্বরাজনীতিতে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি বহু আগেই পরিবর্তনের সময় এসেছে। একইদিনে ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক অধিবেশনে শি জিন পিং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতি পরিহার করার আহ্বান জানান। এই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে বাস্তবমুখী করতে পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। এই পাঁচ দফা প্রস্তাব হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য, ডিজিটাল অর্থনীতি, আধুনিক উৎপাদন খাত এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মানব-সম্পদ উন্নয়ন। বিদ্যমান বাস্তবতায় শি জিন পিংয়ের এই প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক ও গুরূত্বপূর্ণ। আশা করা যায়, তার নেতৃত্বাধীন ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোতে এই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুতায়িত হবে। ব্রিকস বস্তুত পশ্চিমা শাসন, শোষণ, খবরদারি, আগ্রাসন, যুদ্ধ, সংঘাত ইত্যাদির প্রতিবাদী বা বিকল্প জোট। এই লক্ষ্য ও অবস্থান সামনে রেখেই আগামী দিনে জোটের পরিচালনপন্থা নির্ধারণ ও নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশ কেন ব্রিকসের সদস্য নয়? অতীতে যারা ক্ষমতাসীন ছিলেন, এ প্রশ্নের জবাব তারাই ভালো দিতে পারবেন। জানা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আবেদন জানায়। যে কারণেই হোক, এর সদস্যপদ লাভের সুযোগ তার হয়নি। তবে জোটের অন্তর্গত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য বাংলাদেশ। যেহেতু ব্রিকস গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর সুতরাং, জোটের সদস্যপদ লাভ করা বাংলাদেশের অধিকারও বটে। চীন ব্রিকসের নেতৃত্বে আসায় বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের সম্ভাবনা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। সরকার এ ব্যাপারে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবে বলে আমরা আশা করি।